ভূমিকা: হালাল রিজিকের গুরুত্ব
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন: “আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা বাকারা: ২৭৫) এই একটি আয়াতেই ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি নিহিত। কিন্তু আধুনিক যুগে, যেখানে ডিজিটাল অর্থনীতি প্রসারিত হচ্ছে দ্রুতগতিতে, সেখানে মুসলিমদের সামনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রশ্ন আসছে—এই কাজ হালাল নাকি হারাম?
২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। লাখ লাখ তরুণ-তরুণী অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ করে আয় করছেন। একইভাবে, শেয়ার বাজারও হয়ে উঠেছে বিনিয়োগের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই আয় কি হালাল? কোন শর্তে বৈধ, আর কোন পরিস্থিতিতে হারাম?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “অবশ্যই হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দুটির মাঝখানে রয়েছে কিছু সন্দেহপূর্ণ বস্তু; যা অনেক লোকেই জানে না। অতএব যে ব্যক্তি এই সন্দেহপূর্ণ বিষয় সমূহ হতে দূরে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করবে।”
এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব ফ্রিল্যান্সিং ও শেয়ার বাজারে হালাল উপার্জনের পথ, শরিয়াহ স্ক্রিনিং পদ্ধতি, এবং ২০২৬ সালের বাস্তবতায় কীভাবে একজন মুসলিম বৈধভাবে আয় করতে পারেন তা নিয়ে।
পর্ব ১: ফ্রিল্যান্সিং—হালাল ইনকামের নতুন দিগন্ত
ফ্রিল্যান্সিং কী এবং এটি কি বৈধ?
ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তলব অনুযায়ী কাজ করার নাম হচ্ছে, ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং। এটি মূলত একটি চুক্তিভিত্তিক কাজ, যেখানে আপনি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে দেবেন এবং তার বিনিময়ে পারিশ্রমিক পাবেন।
হ্যাঁ, ফ্রিল্যান্সিং হালাল। ইসলামিক নিয়ম মেনে অর্থ উপার্জনের জন্য ফ্রিল্যান্স সেক্টরে অনেকগুলি উপায় এবং উপকরণ রয়েছে। কিন্তু এর বৈধতা নির্ভর করে কাজের ধরন এবং শর্তাবলির উপর।
ফ্রিল্যান্সিং হালাল হওয়ার শর্তসমূহ
কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে ফ্রিল্যান্সিং করা এবং তার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা বৈধ। যথা: ১. ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে কাজটি হালাল হওয়া (হারাম না হওয়া)।
মূল শর্তাবলী:
১. কাজের প্রকৃতি হালাল হতে হবে
আপনি যে সেবা প্রদান করছেন তা ইসলামসম্মত হতে হবে। যে কোম্পানি বা ব্যক্তির জন্য কাজ করছেন, তাদের ব্যবসা হারাম হলে আপনার আয়ও হারাম হবে।
২. চুক্তি স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হতে হবে
কাজের ধরন, সময়সীমা, পারিশ্রমিক—সবকিছু পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত থাকতে হবে। মার্কেটপ্লেসে কাজের শুরুতে, বিক্রেতা এবং ক্রেতা কাজের শর্তাদি বিশদ নিয়ে আলোচনা করেন। অতএব, এই দৃষ্টিকোণ থেকে কাজটি অবৈধ বলে বলার মতো কোনও উত্স নেই।
৩. প্রতারণা মুক্ত হতে হবে
কাজের বিবরণে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, নকল বা চুরি করা কন্টেন্ট জমা দেওয়া, কিংবা কাজ না করে পেমেন্ট নেওয়া—এসব হারাম।
৪. পেমেন্ট সিস্টেম সুদমুক্ত হতে হবে
অধিকাংশ মার্কেটপ্লেসে (Upwork, Fiverr, Freelancer.com) পেমেন্ট সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফার বা পেপাল/পেওনিয়ারের মাধ্যমে হয়, যাতে সুদের লেনদেন নেই। এটি বৈধ।
যে কাজগুলো হালাল
এই বইটিতে দেখানো হয়েছে কী কী বিষয় নিয়ে হালালভাবে ফ্রিল্যান্সিং করা সম্ভব, কাজগুলোর ডিমান্ড কেমন, অন্যরা কেমন আয় করছে, কাজ শেখার উপায় কী ইত্যাদি।
১. গ্রাফিক ডিজাইন
ক্লায়েন্টদের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণীয় গ্রাফিক্স, লোগো এবং অন্যান্য ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট ডিজাইন করা। তবে অশ্লীল কোনো ডিজাইন করা যাবে না।
হালাল গ্রাফিক ডিজাইনের উদাহরণ:
- ব্যবসায়িক লোগো ডিজাইন
- সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ডিজাইন
- ব্রুশিওর, ফ্লায়ার, পোস্টার
- বুক কভার ডিজাইন
- ইনফোগ্রাফিক্স
যা এড়াতে হবে: মদ, বিয়ার, সিগারেট কোম্পানির বিজ্ঞাপন ডিজাইন, নাইটক্লাব বা ক্যাসিনোর প্রচারণা, অশ্লীল বা উত্তেজক ছবিযুক্ত কন্টেন্ট, মূর্তি বা প্রাণীর প্রতিকৃতি যা ইবাদতের উদ্দেশ্যে।
২. ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট
ব্যক্তি বা ব্যবসায়ের জন্য ওয়েবসাইট তৈরির কাজও করা যাবে। এটা সম্পূর্ণ হালাল। তবে এডাল্ট বা বেটিং টাইপের সাইট তৈরি করে দিয়ে ইনকাম করা যাবে না।
হালাল ওয়েব প্রজেক্ট:
- ই-কমার্স ওয়েবসাইট (হালাল পণ্যের)
- কর্পোরেট ওয়েবসাইট
- শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম
- ব্লগ বা নিউজ পোর্টাল
- ইসলামিক ওয়েবসাইট ও অ্যাপ
যা এড়াতে হবে: জুয়া/বেটিং সাইট, পর্নোগ্রাফি সাইট, ডেটিং অ্যাপ্লিকেশন, সুদভিত্তিক ঋণ প্রদানকারী সাইট।
৩. কন্টেন্ট রাইটিং ও কপিরাইটিং
হালাল বিষয়ে লেখালেখি সম্পূর্ণ বৈধ:
- ব্লগ আর্টিকেল লেখা
- এসইও কন্টেন্ট রাইটিং
- প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশন
- টেকনিক্যাল রাইটিং
- ই-বুক রাইটিং
যা এড়াতে হবে: মদ, জুয়া, পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত কন্টেন্ট, মিথ্যা তথ্য প্রচার, অন্যের কন্টেন্ট চুরি করে নিজের নামে চালানো (প্লেজিয়ারিজম)।
৪. ডিজিটাল মার্কেটিং
যে কোনো হালাল পণ্যের বিজ্ঞাপন তৈরি ও প্রচারে করা যাবে। তবে হারাম পণ্য যেমন মদ বা জুয়ার বার ইত্যাদি।
হালাল মার্কেটিং:
- সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং
- এসইও (Search Engine Optimization)
- ইমেইল মার্কেটিং
- কনটেন্ট মার্কেটিং
- ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট
শর্ত: যে পণ্য বা সেবার মার্কেটিং করছেন তা হালাল হতে হবে।
৫. ভিডিও এডিটিং
ইউটিউব ভিডিও, প্রমোশনাল ভিডিও, ট্রেনিং ভিডিও এডিট করা হালাল, যতক্ষণ কন্টেন্ট হালাল।
যা এড়াতে হবে: মিউজিক ভিডিও এডিটিং (যদি হারাম মিউজিক হয়), অশ্লীল ভিডিও এডিট, মিথ্যা প্রচারণার ভিডিও।
৬. ডাটা এন্ট্রি ও ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট
অফিস সহায়তামূলক কাজ যেমন ইমেইল ম্যানেজমেন্ট, ডেটা এন্ট্রি, শিডিউলিং—এগুলো সম্পূর্ণ হালাল।
৭. প্রোগ্রামিং ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট
অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার তৈরি, প্লাগইন ডেভেলপমেন্ট—সব হালাল, যদি সফটওয়্যার হালাল কাজে ব্যবহৃত হয়।
যে কাজগুলো হারাম বা এড়িয়ে চলতে হবে
পণ্যটি যদি হালাল হয় তাহলে তা হালাল কিন্তু পণ্যটি হারাম হলে তা অবশ্যই হারাম। যেমন: মদ-নেশা, বিড়ি-সিগারেট, মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক, খাঁটি পণ্যের লেভেল লাগানো নকল পণ্য, সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ পণ্য ইত্যাদি।
হারাম ফ্রিল্যান্সিং কাজ:
১. অশ্লীল কন্টেন্ট তৈরি বা প্রচার
- পর্নোগ্রাফি সাইটের জন্য কাজ
- অশ্লীল ছবি এডিট বা ডিজাইন
- ডেটিং অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট
২. জুয়া/বেটিং সম্পর্কিত কাজ
- ক্যাসিনো ওয়েবসাইট তৈরি
- বেটিং অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট
- জুয়া কোম্পানির মার্কেটিং
৩. মদ, সিগারেট, নেশা
- মদ কোম্পানির বিজ্ঞাপন ডিজাইন
- তামাক পণ্যের প্রচারণা
- মাদক সম্পর্কিত কন্টেন্ট
৪. প্রতারণামূলক কাজ
- ফেইক রিভিউ লেখা
- স্প্যাম ইমেইল পাঠানো
- ক্লিকবেইট কন্টেন্ট তৈরি
- এসইও ম্যানিপুলেশন (ব্ল্যাক হ্যাট এসইও)
৫. কপিরাইট লঙ্ঘন
- পাইরেটেড সফটওয়্যার বিতরণ
- অন্যের কন্টেন্ট চুরি করে বিক্রি
৬. সুদভিত্তিক ব্যবসার সহায়তা
- ঋণদাতা কোম্পানির প্রচারণা (যারা সুদ নেয়)
- ক্রেডিট কার্ড প্রমোশন (সুদভিত্তিক)
হালাল ইনকাম নিশ্চিত করার উপায়
আমি দিন রাত কষ্ট করে নিজের ও পরিবারের জন্য যে উপার্জন করছি তা অবশ্যই হালাল হওয়া বাঞ্ছনীয়। একবার চিন্তা করে দেখুন, যে মানুষগুলোর জন্য হালাল হারাম বাছ-বিচার না করে দুহাতে টাকা ইনকাম করছেন সেই মানুষগুলোই যখন হাশরের মাঠে বলবে “তোমার হারাম উপার্জনের সাথে আমরা নেই, এর দায় আমরা নেবো না!” তখন কেমন লাগবে আপনার?
প্র্যাকটিক্যাল গাইডলাইন:
১. ক্লায়েন্ট যাচাই করুন প্রজেক্ট গ্রহণের আগে দেখুন:
- ক্লায়েন্টের ব্যবসা কী?
- তারা কী ধরনের পণ্য/সেবা বিক্রি করে?
- প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কী?
২. পরিষ্কার চুক্তি করুন
- কাজের বিবরণ লিখিত থাকবে
- পেমেন্ট শর্ত স্পষ্ট থাকবে
- ডেডলাইন নির্ধারিত থাকবে
৩. সন্দেহজনক কাজ এড়িয়ে চলুন যদি কোনো প্রজেক্ট নিয়ে সন্দেহ হয়, তাহলে সেটি প্রত্যাখ্যান করুন। টাকার লোভে হারামে জড়াবেন না।
৪. দক্ষতা অর্জন করুন হালাল ক্ষেত্রে দক্ষ হন, যাতে আপনাকে সন্দেহজনক কাজ নিতে না হয়।
পর্ব ২: শেয়ার বাজার—ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
শেয়ার ব্যবসার মৌলিক ধারণা
শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় একটি বহুল প্রচলিত আয়ের মাধ্যম। বর্তমানে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়কে পার্টনারশিপ ব্যবসা বলা যেতে পারে। কোনো কোম্পানির শেয়ারকে আরবিতে সাহম বলে। সাহম অর্থ অংশ। অর্থাৎ শেয়ার হচ্ছে শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন কোম্পানির সম্পদের অংশবিশেষের নাম।
যখন আপনি কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনেন, তখন আপনি সেই কোম্পানির একটি অংশের মালিক হয়ে যান। এর মানে হলো:
- কোম্পানির লাভ-ক্ষতিতে আপনি অংশীদার
- কোম্পানির সম্পদে আপনার অধিকার আছে
- কোম্পানির সিদ্ধান্তে ভোট দেওয়ার অধিকার আছে (শেয়ারের পরিমাণ অনুযায়ী)
শেয়ার ব্যবসা: হালাল না হারাম?
মূল ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনার তারতম্যের ভিত্তিতে ফকিহরা বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। ১. যেসব কোম্পানির মূল ব্যবসা ও সব লেনদেন শরিয়সম্মত ও সুদমুক্ত। এসব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে যদি গ্যাম্বলিং না হয়, তাহলে তা সমকালীন প্রায় সব ফকিহের মতে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েজ। ২. যেসব কোম্পানির মূল ব্যবসা হারাম। যেমন মদ ব্যবসা, সুদি ব্যবসা ইত্যাদি। এসব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ নেই। ৩. যেসব কোম্পানির মূল ব্যবসা হালাল, তবে কোনো না কোনোভাবে তা শরিয়তবিরোধী কাজ বা সুদি লেনদেনের সঙ্গে জড়িত।
এই তৃতীয় ক্যাটাগরিতেই বেশিরভাগ বাংলাদেশি কোম্পানি পড়ে, যা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
শারীয়াহ-কমপ্লায়েন্ট স্টক: AAOIFI স্ট্যান্ডার্ড
আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামিক ফাইন্যান্সে AAOIFI standards serve as a global benchmark for Shariah compliance, emphasizing business activities that comply with Islamic ethical and financial principles. The AAOIFI’s Shariah Standard No. 21 focuses on two critical dimensions for determining if a stock is halal: the Qualitative Screening of a company’s business and the Quantitative Screening of its financial ratios.
১. গুণগত স্ক্রিনিং (Qualitative Screening)
Qualitative Screening excludes companies involved in haram business activities such as alcohol, gambling, pork, and weapons.
যে ব্যবসা সম্পূর্ণ হারাম:
- মদ উৎপাদন ও বিক্রয়
- শূকরের মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ
- জুয়া/ক্যাসিনো
- পর্নোগ্রাফি
- সুদভিত্তিক ব্যাংক (প্রচলিত ব্যাংক)
- সুদভিত্তিক বীমা
- তামাক/সিগারেট
- অস্ত্র উৎপাদন (নিরপরাধ মানুষ হত্যার জন্য)
২. পরিমাণগত স্ক্রিনিং (Quantitative Screening)
Quantitative Screening applies three main filters: total interest-bearing debt should not exceed 30% of market capitalization; haram income must be less than 5% of total revenue; and interest-earning (non-compliant) investments should not exceed 30% of market capitalization.
তিনটি মূল অনুপাত:
ক. ঋণের অনুপাত ≤ ৩০% কোম্পানির সুদভিত্তিক ঋণ মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের ৩০% এর বেশি হতে পারবে না।
খ. হারাম আয় ≤ ৫% মোট আয়ের ৫% এর বেশি হারাম উৎস থেকে আসতে পারবে না। যেমন কোনো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি যদি ৯৫% হালাল ওষুধ বিক্রি করে এবং ৫% বা তার কম মদযুক্ত পণ্য বিক্রি করে, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য (তবে সেই ৫% পিউরিফাই করতে হবে)।
গ. সুদভিত্তিক বিনিয়োগ ≤ ৩০% কোম্পানির বিনিয়োগের মধ্যে সুদভিত্তিক সম্পদ ৩০% এর বেশি হতে পারবে না।
বিশ্বব্যাপী হালাল স্টকের উদাহরণ (২০২৬):
- টেকনোলজি: Apple, Microsoft, NVIDIA, Intel, Adobe
- ই-কমার্স: Amazon (কিছু শর্তসাপেক্ষে), Shopify
- ফার্মাসিউটিক্যালস: Johnson & Johnson, Pfizer
- কনজিউমার গুডস: Procter & Gamble, Unilever
- টেলিকম: AT&T, Verizon
বাংলাদেশে হালাল স্টক চিহ্নিতকরণ:
দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে এখনও সরকারি পর্যায়ে শারীয়াহ-কমপ্লায়েন্ট স্টকের অফিশিয়াল তালিকা নেই। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্ক্রিনিং করছে:
সম্ভাব্য হালাল সেক্টর (যাচাই সাপেক্ষে):
- ফার্মাসিউটিক্যালস: Square Pharmaceuticals, Beximco Pharma, ACME Labs
- খাদ্য: PRAN-RFL, ACI, Nestle Bangladesh
- টেক্সটাইল: যেগুলো সুদমুক্ত
- টেলিকম: Grameenphone, Robi (যদি ঋণের অনুপাত মানদণ্ড পূরণ করে)
- পাওয়ার: বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি (হালাল উৎস থেকে)
যা এড়াতে হবে:
- সব প্রচলিত ব্যাংক (সুদভিত্তিক)
- প্রচলিত বীমা কোম্পানি
- সিগারেট/তামাক কোম্পানি: British American Tobacco Bangladesh
পিউরিফিকেশন (পরিশুদ্ধকরণ): অপরিহার্য দায়িত্ব
If non-compliant income exceeds the 5% threshold, purification becomes necessary. Investors must calculate and donate the portion of income attributable to haram sources to charity, ensuring their earnings remain halal.
পিউরিফিকেশনের পদ্ধতি:
মনে করুন, আপনি একটি কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন যার ৩% আয় সুদ থেকে আসে। আপনি যদি ১০,০০০ টাকা লভ্যাংশ পান, তাহলে:
হারাম অংশ = ১০,০০০ × ৩% = ৩০০ টাকা
এই ৩০০ টাকা আপনাকে দাতব্যে দিয়ে দিতে হবে (নিজের সওয়াবের নিয়তে নয়, বরং পরিশুদ্ধকরণের জন্য)।
গুরুত্বপূর্ণ: এই দান সদকা নয়, এটি বাধ্যতামূলক পরিশুদ্ধকরণ। এর জন্য সওয়াবের নিয়ত করা যাবে না।
শেয়ার ব্যবসায় হারাম যা
১. স্পেকুলেশন/জুয়া
যেসব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে যদি গ্যাম্বলিং না হয়, তাহলে তা জায়েজ।
শেয়ার কেনার সময় যদি আপনি কোম্পানির ভবিষ্যৎ না দেখে শুধু দাম বাড়া-কমার উপর বাজি ধরেন, তাহলে এটি জুয়ার পর্যায়ে চলে যায়।
হালাল পদ্ধতি: কোম্পানির ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্ট পড়ুন, ব্যবসা বুঝুন, তারপর দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করুন।
হারাম পদ্ধতি: র্যান্ডমভাবে কোনো স্টক কিনে দাম বাড়ার আশায় বসে থাকা, রিসার্চ ছাড়া ট্রেডিং।
২. ডে ট্রেডিং/স্ক্যাল্পিং (বিতর্কিত)
দিনে ১০-২০ বার কেনাবেচা, মিনিটে মিনিটে ট্রেড—অনেক আলেম এটিকে জুয়ার মতো মনে করেন কারণ এতে আসল ব্যবসায় অংশীদারিত্বের চেয়ে ফটকাবাজির উদ্দেশ্য প্রধান।
মধ্যপন্থী মতামত: যদি প্রকৃত শেয়ার লেনদেন হয় (T+2 সেটেলমেন্ট সহ) এবং কোম্পানি হালাল হয়, তাহলে অল্প সময়ের জন্য রাখাও বৈধ, তবে এটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
৩. শর্ট সেলিং
যে শেয়ার আপনার মালিকানায় নেই, তা বিক্রি করা—এটি সুস্পষ্ট হারাম। ইসলামে এমন কিছু বিক্রি নিষিদ্ধ যা আপনার নিজের নয়।
৪. ম্যার্জিন ট্রেডিং (লিভারেজ)
ব্রোকার থেকে সুদের ভিত্তিতে ঋণ নিয়ে ট্রেড করা—এটি সুস্পষ্ট সুদ, তাই হারাম।
৫. ফিউচার ও অপশন ট্রেডিং
এগুলো ডেরিভেটিভ যা মূলত অনিশ্চয়তা (gharar) ও জুয়ার (maisir) উপর ভিত্তি করে। অধিকাংশ আলেম এগুলো হারাম বলেছেন।
হালাল শেয়ার বিনিয়োগের নীতিমালা
১. দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করুন
শেয়ার কিনুন কোম্পানির অংশীদার হওয়ার জন্য, দ্রুত লাভের জন্য নয়। ৫-১০ বছরের দৃষ্টিভঙ্গি রাখুন।
২. রিসার্চ করুন
- কোম্পানির ব্যবসা কী?
- তাদের আয়ের উৎস কী?
- ঋণের পরিমাণ কত?
- মুনাফা কীভাবে হয়?
৩. শারীয়াহ স্ক্রিনিং করুন
AAOIFI বা MSCI Islamic Indices-এর মানদণ্ড অনুসরণ করুন।
৪. ডাইভার্সিফাই করুন
সব টাকা এক কোম্পানিতে না রেখে ৫-১০টি হালাল কোম্পানিতে ভাগ করুন।
৫. পিউরিফাই করুন
যদি কোনো হারাম আয় থাকে, তা দাতব্যে দিয়ে দিন।
৬. যাকাত দিন
শেয়ারের মূল্যের উপর বার্ষিক ২.৫% যাকাত দিতে হবে।
পর্ব ৩: বাস্তব প্রয়োগ—২০২৬ সালের পরিকল্পনা
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য হালাল ইনকাম প্ল্যান
স্তর ১: দক্ষতা অর্জন (১-৬ মাস)
- একটি হালাল স্কিল শিখুন (গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কন্টেন্ট রাইটিং)
- অনলাইন কোর্স করুন: Coursera, Udemy, YouTube
- প্র্যাকটিস প্রজেক্ট করুন
স্তর ২: পোর্টফোলিও তৈরি (২-৩ মাস)
- ৫-১০টি ডেমো প্রজেক্ট তৈরি করুন
- GitHub, Behance, বা Dribbble-এ প্রকাশ করুন
- ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট তৈরি করুন
স্তর ৩: মার্কেটপ্লেসে যোগদান
হালাল মার্কেটপ্লেস:
- Upwork
- Fiverr
- Freelancer.com
- Toptal
- 99designs (ডিজাইনের জন্য)
প্রোফাইল তৈরিতে হালাল নীতি:
- মিথ্যা তথ্য দেবেন না
- অতিরঞ্জিত দাবি করবেন না
- কাজের নমুনা চুরি করবেন না
স্তর ৪: ক্লায়েন্ট নির্বাচন
প্রথম প্রজেক্ট গ্রহণের আগে:
- ক্লায়েন্টের প্রোফাইল দেখুন
- তাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন
- কাজের বিবরণ ভালো করে পড়ুন
- যদি সন্দেহজনক মনে হয়, পোলাইটলি রিজেক্ট করুন
স্তর ৫: হালাল আয় নিশ্চিতকরণ
- চুক্তি পরিষ্কার রাখুন
- সময়মতো কাজ ডেলিভারি দিন
- ক্লায়েন্টের সাথে সৎভাবে যোগাযোগ করুন
- পেমেন্ট ট্রান্সপেরেন্টলি নিন
- যাকাত হিসাব রাখুন (বার্ষিক আয়ের ২.৫%)
শেয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য হালাল পোর্টফোলিও
ধাপ ১: শিক্ষা (১-২ মাস)
- স্টক মার্কেটের বেসিক শিখুন
- ইসলামিক ফাইন্যান্সের নীতি পড়ুন
- AAOIFI স্ট্যান্ডার্ড বুঝুন
ধাপ ২: স্ক্রিনিং টুল ব্যবহার
আন্তর্জাতিক টুল:
- Zoya App (ফ্রি, খুবই ভালো)
- Islamicly App
- Musaffa
- MSCI Islamic Indices
এই অ্যাপগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাজারো স্টক স্ক্রিন করে হালাল-হারাম চিহ্নিত করে।
ধাপ ৩: ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খুলুন
বাংলাদেশে:
- যেকোনো ব্রোকারেজ হাউসে অ্যাকাউন্ট খুলুন
- KYC সম্পন্ন করুন
- BO (Beneficiary Owner) অ্যাকাউন্ট পান
সতর্কতা: ম্যার্জিন ট্রেডিং সুবিধা নেবেন না, এটি সুদভিত্তিক।
ধাপ ৪: পোর্টফোলিও তৈরি
উদাহরণ পোর্টফোলিও (১,০০,০০০ টাকা):
- ৩০% টেকনোলজি (হালাল স্টক যাচাই করে)
- ২৫% ফার্মাসিউটিক্যালস
- ২০% কনজিউমার গুডস
- ১৫% টেলিকম
- ১০% ক্যাশ (জরুরী প্রয়োজনে)
ধাপ ৫: মনিটরিং ও পিউরিফিকেশন
- প্রতি কোয়ার্টারে কোম্পানির ফাইনান্সিয়াল রিপোর্ট চেক করুন
- হারাম আয়ের পার্সেন্টেজ দেখুন
- প্রয়োজনে পিউরিফাই করুন
- বার্ষিক যাকাত হিসাব করুন
পর্ব ৪: সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১: ক্রিপ্টোকারেন্সি কি হালাল?
উত্তর: বিতর্কিত। অধিকাংশ আলেম বিটকয়েন ট্রেডিংকে জুয়ার মতো মনে করেন। তবে কিছু আলেম বলেছেন, যদি ক্রিপ্টো কোনো হালাল প্রজেক্টের সাথে যুক্ত হয় (যেমন ইসলামিক ফিনটেক) এবং স্পেকুলেশনের জন্য নয় বরং ব্যবহারের জন্য কেনা হয়, তাহলে বৈধ হতে পারে। সাধারণভাবে সতর্কতার জন্য এড়িয়ে চলাই ভালো।
প্রশ্ন ২: ETF/Mutual Fund কি হালাল?
উত্তর: শারীয়াহ-কমপ্লায়েন্ট ETF আছে, যেমন SPUS (SP Funds S&P 500 Sharia Industry Exclusions ETF)। কিন্তু সাধারণ ETF/Mutual Fund এড়িয়ে চলুন কারণ সেগুলোতে হারাম স্টক মিশ্রিত থাকে।
প্রশ্ন ৩: ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টের সুদ নেওয়া যাবে?
উত্তর: না। তবে যদি ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে দিয়ে দেয় এবং ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সেই টাকা দাতব্যে দিয়ে দিতে হবে (নিজের সওয়াবের নিয়তে নয়)।
প্রশ্ন ৪: ফ্রিল্যান্সিংয়ে পেপাল/পেওনিয়ার কি হালাল?
উত্তর: হ্যাঁ, এগুলো পেমেন্ট গেটওয়ে মাত্র। যদি আপনি সুদ না নেন এবং তাদের লোন সার্ভিস ব্যবহার না করেন, তাহলে বৈধ।
প্রশ্ন ৫: সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কি সবসময় হালাল?
উত্তর: নির্ভর করে কিসের মার্কেটিং করছেন। হালাল পণ্য/সেবার মার্কেটিং হালাল, হারাম পণ্যের (মদ, জুয়া, ইত্যাদি) মার্কেটিং হারাম।
প্রশ্ন ৬: IPO-তে বিনিয়োগ করা যাবে?
উত্তর: যদি কোম্পানি হালাল হয় এবং শারীয়াহ মানদণ্ড পূরণ করে, তাহলে IPO-তে বিনিয়োগ বৈধ।
প্রশ্ন ৭: রিয়েল এস্টেট ক্রাউডফান্ডিং কি হালাল?
উত্তর: যদি:
- সম্পত্তি হালাল উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় (মদের দোকান নয়)
- চুক্তি স্পষ্ট হয়
- সুদ জড়িত না থাকে
তাহলে বৈধ।
উপসংহার: বরকতময় উপার্জনের পথ
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “হে মানুষ, পৃথিবীতে যা হালাল এবং পবিত্র বস্তু রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা বাকারা: ১৬৮)
২০২৬ সালে এসে আমাদের সামনে উপার্জনের অসংখ্য পথ খুলে গেছে—ফ্রিল্যান্সিং, শেয়ার বাজার, ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স। কিন্তু এই সব পথে হাঁটার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে—রিজিক আল্লাহর হাতে, এবং তিনি হালাল পথে দিবেন শুধু তখনই যখন আমরা হালাল পথ খুঁজব।
মনে রাখবেন:
১. টাকার চেয়ে বরকত বড়: হারাম উপার্জনে বরকত নেই। ১ লাখ হালাল টাকা ১০ লাখ হারাম টাকার চেয়ে উত্তম।
২. দুনিয়া অস্থায়ী, আখিরাত চিরস্থায়ী: আজকের হারাম উপার্জন আখিরাতে জাহান্নামের কারণ হতে পারে।
৩. সৎভাবে কম আয় অসৎভাবে বেশি আয়ের চেয়ে সম্মানজনক: আপনার সন্তান যখন জানবে বাবা হালাল উপার্জন করতেন, তখন তারা গর্বিত হবে।
৪. দোয়া ও তাকওয়া রিজিকের দরজা খুলে দেয়: “যে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে) বের হওয়ার পথ করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারেনি।” (সূরা তালাক: ২-৩)
৫. যাকাত দিন, দান করুন: হালাল সম্পদ বাড়ে দানে, হারাম সম্পদ শেষ হয় অভিশাপে।
আজই সিদ্ধান্ত নিন—আপনি হালাল পথে চলবেন। প্রথমদিকে কঠিন মনে হতে পারে, কিছু সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, “যে তাকওয়া অবলম্বন করবে, আল্লাহ তার জন্য পথ সহজ করে দেবেন।”
২০২৬ সালে ফ্রিল্যান্সিং ও শেয়ার বাজার হতে পারে আপনার হালাল রিজিকের মাধ্যম—যদি আপনি সঠিক জ্ঞান, সতর্কতা ও তাকওয়ার সাথে এগিয়ে যান।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনের তৌফিক দান করুন এবং হারাম থেকে বাঁচার শক্তি দিন। আমীন।
মূল শব্দ: হালাল ইনকাম, ফ্রিল্যান্সিং ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি, শেয়ার বাজার হালাল হারাম, শারীয়াহ কমপ্লায়েন্ট স্টক, AAOIFI স্ট্যান্ডার্ড, ইসলামিক ফাইন্যান্স, হারাম ব্যবসা, সুদমুক্ত বিনিয়োগ, যাকাত, পিউরিফিকেশন, বাংলাদেশ স্টক মার্কেট, অনলাইন আয়, ২০২৬ ফিনান্স