ভূমিকা: পানি – সহযোগিতা না সংঘাতের হাতিয়ার?
পানি জীবনের উৎস। পানি সভ্যতার ভিত্তি। কিন্তু পানি একইসাথে হতে পারে দ্বন্দ্বের কারণ। খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ২৫০০ সালে সুমেরীয় শহর লাগাশ এবং উম্মার মধ্যে টাইগ্রিস নদীর পানি নিয়ে বিরোধ বাধে। একটি চুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হয়। এটিকে মানব ইতিহাসের প্রথম চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৬ সাল। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের জন্য এটি একটি ক্রান্তিকাল। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালে। একইসাথে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি, যা ১৪ বছর ধরে অমীমাংসিত, তার সমাধান এখনও অধরা। ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি দীর্ঘদিনের একটি প্রধান দ্বিপক্ষীয় সমস্যা, যা বাংলাদেশ, ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে জটিল রাজনৈতিক সংকটে জড়িয়ে আছে।
এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানি রাজনীতি, ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা এবং ২০২৬ সালে কী হতে পারে। আমরা চেষ্টা করব নিরপেক্ষ থাকতে, তবে যেখানে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার রয়েছে, সেখানে আমরা দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলব।
পর্ব ১: তিস্তা নদী – উত্তরবঙ্গের প্রাণ, বাংলাদেশের অধিকার
তিস্তার ভূগোল ও গুরুত্ব
তিস্তা হিমালয়ের সিকিমে উৎপন্ন হয়, পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর (বাংলাদেশে যা যমুনা নামে পরিচিত) সাথে মিলিত হওয়ার আগে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তিস্তা ৪১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী যা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং সিকিম হয়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হয়।
বাংলাদেশের জন্য তিস্তার গুরুত্ব:
তিস্তা বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী, রংপুর বিভাগের মধ্য দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। তিস্তার প্লাবনভূমি ২,৭৫০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত, যা বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ, প্রাণী, বাস্তুতন্ত্র এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা সমর্থন করে।
তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প, বাংলাদেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প, তিস্তা নদীর পানি ব্যবহার করে প্রায় ৫৪০,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করে। এর কমান্ড এরিয়া ৭৫০,০০০ হেক্টর নিয়ে গঠিত এবং সাতটি জেলার অংশ অন্তর্ভুক্ত করে: নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা এবং জয়পুরহাট।
এশিয়া ফাউন্ডেশনের ২০১৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিস্তার প্লাবনভূমি বাংলাদেশের মোট চাষকৃত এলাকার প্রায় ১৪% জুড়ে এবং এর জনসংখ্যার প্রায় ৭৩%-কে সরাসরি জীবিকার সুযোগ প্রদান করে।
সহজ ভাষায়: তিস্তা শুধু একটি নদী নয়—এটি উত্তরবঙ্গের কৃষক, মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষের জীবনরেখা। তিস্তা বন্ধ মানে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি মৃত।
তিস্তা বিরোধের ইতিহাস: ১৯৪৭ থেকে ২০২৬
তিস্তা নদী নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময়। সেই সময় নদীর অববাহিকা দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়—একটি ভারতের এবং অপরটি নবগঠিত রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) এর অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৮৩ সালে ভারত এবং বাংলাদেশ একটি অস্থায়ী পানি বণ্টন চুক্তি করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, তিস্তার পানির ৩৯% ভারতের এবং ৩৬% বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হয়। তবে, এই চুক্তি কখনো স্থায়ী চুক্তিতে রূপান্তরিত হয়নি।
২০১১: আশার আলো, তারপর অন্ধকার
২০১১ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি করার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করে। সেই সময় একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তাব করা হয়, যা শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার ৩৭.৫% পানি বাংলাদেশকে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। ভারত সম্মত হয়েছিল তিস্তার পানির ৪২.৫% ধরে রাখতে, বাকি পরিবেশগত প্রবাহের জন্য।
তবে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার রাজ্যের পানির সংকটের উদ্বেগ জানিয়ে এর বিরোধিতা করেন। এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারতের জন্য তিস্তা নদী নিয়ে বিরোধ সমাধানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সইয়ের সবই ঠিকঠাক হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা মমতা ব্যানার্জি আপত্তি তুললে সেই চুক্তি আর আলোর মুখ দেখেনি।
বর্তমান পরিস্থিতি: উজানে বাঁধ, ভাটিতে বিপর্যয়
ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ, বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজের উজানে, পানি প্রবাহে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব ফেলেছে এবং ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা পানি বিরোধ তীব্র করেছে।
ভারতের উজানে বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন, যার মধ্যে বাঁধ, ব্যারাজ এবং জলবিদ্যুৎ কাঠামো রয়েছে, তার কারণে বাংলাদেশে তিস্তা নদীর প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বাস্তব চিত্র:
শুষ্ক মৌসুমে (ডিসেম্বর-এপ্রিল) তিস্তা নদী প্রায় শুকিয়ে যায়। বর্ষায় ভাসে, আবার শীতে পরিণত হয় মরুভূমির মতো বালুচরে। নদীভাঙন, চর গঠন ও তীব্র পানির সংকটে তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ।
আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউট (IFPRI) অনুসারে, পানি সংকটের কারণে বাংলাদেশ বার্ষিক প্রায় ১.৫ মিলিয়ন টন চাল হারাচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে ক্ষতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান: ন্যায্য অধিকার
আন্তর্জাতিক আইনি বিধিব্যবস্থা অনুযায়ী একটি আন্তঃদেশীয় নদী হিসেবে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া বাংলাদেশের অধিকার।
১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশনের ধারা ৫(এ)-তে স্পষ্ট করে বলা আছে যে একটি আন্তর্জাতিক নদীর অববাহিকায় অবস্থিত সব দেশ এই নদীর পানি ন্যায্যতার ভিত্তিতে ও যুক্তিসংগতভাবে ব্যবহার করবে। ধারা ৬(এ)-তে আবার স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে এই ন্যায্যতার ভিত্তি হবে দেশগুলোর প্রকৃতিগত অবস্থান, অর্থনৈতিক কার্যাবলি, জনসংখ্যা, অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো:
ভারত বছরের পর বছর ধরে তাদের দেশের ভেতরে অনেক অভিন্ন নদীর পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ দিয়েছে, যাতে সে শুকনো মৌসুমে বিভিন্ন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নদীগুলো সচল রেখে মানুষের জীবন-জীবিকা ও ফসল উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারে। আবার অতি বৃষ্টি বা বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিলে ওই বাঁধের গেট খুলে দিয়ে নিজের দেশে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে। উজানের দেশ হিসেবে এটি তার সুবিধা। কিন্তু ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশ বারবারই ভারতের এই পানি প্রত্যাহার এবং পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।
ভারতের যুক্তি: পশ্চিমবঙ্গের পানি সংকট
ন্যায়সঙ্গতভাবে বলতে গেলে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গও তিস্তার পানির উপর নির্ভরশীল। তিস্তা উত্তরবঙ্গের প্রাণ এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধডজন জেলা তিস্তার পানির উপর নির্ভরশীল।
কিন্তু এখানে মূল প্রশ্ন: তিস্তার মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়ার ৮৩% ভারতে এবং মাত্র ১৭% বাংলাদেশে। তবে, বাংলাদেশের ১৭% এরিয়া সমতল কৃষিভূমি যেখানে লক্ষ লক্ষ কৃষক নির্ভরশীল, অন্যদিকে ভারতের বেশিরভাগ অংশ পাহাড়ি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা: রাজনীতি নাকি বাস্তবতা?
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সাল থেকে তিস্তা চুক্তির প্রধান বাধা। ২০১১ সালে ইউপিএ-২ সরকারের সময়, ভারত ও বাংলাদেশ প্রায় তিস্তার পানি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল, কিন্তু ব্যানার্জি তার সমর্থন প্রত্যাহার করলে তা ভেঙে যায়।
তার যুক্তি: পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে পানি সংকট। কিন্তু সমালোচকরা বলেন, এটি বেশিরভাগই রাজনৈতিক। কেন্দ্রীয় সরকার (কংগ্রেস বা বিজেপি যেটাই হোক) বাংলাদেশের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে চাইলে মমতা বাধা দেন কেন্দ্রকে দুর্বল করতে।
পর্ব ২: গঙ্গা চুক্তি—১৯৯৬ থেকে ২০২৬
গঙ্গা: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণ
গঙ্গা (বাংলাদেশে পদ্মা) তিস্তার চেয়ে আরও বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ নদী। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য অত্যাবশ্যক। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল—এই অঞ্চলের মানুষ গঙ্গার পানির উপর নির্ভরশীল।
ফারাক্কা ব্যারাজ: সমস্যার শুরু
১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করে। এটি গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে কলকাতা বন্দর সচল রাখার জন্য। কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশে পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়।
ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোয় প্রবাহ কমে গিয়ে সেখানের জীবন-জীবিকায় ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি হয়েছিল ৩০ বছরের জন্য, ২০২৬ সালে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত, একটি যুগান্তকারী চুক্তি যা গঙ্গা নদীর জন্য ৩০ বছরের পানি-ভাগাভাগির ব্যবস্থা স্থাপন করে।
চুক্তি শুষ্ক মাসে (জানুয়ারি ১ থেকে মে ৩১) ফারাক্কা ব্যারাজে গঙ্গা নদীর প্রবাহ ভাগ করে দেয় চুক্তিতে বর্ণিত একটি সূত্র অনুসারে।
চুক্তির মূল পয়েন্ট:
- যদি প্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেকের নিচে হয়, দুই দেশ সমানভাবে ভাগ করবে
- যদি প্রবাহ ৭৫,০০০ কিউসেক বা বেশি হয়, বাংলাদেশ ৩৫,০০০ কিউসেক পাবে
- মাঝের পরিমাণে জটিল ফর্মুলা প্রযোজ্য
চুক্তির সমস্যা: বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না
গঙ্গা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে যে পরিমাণ পানি পাচ্ছে, তা কোনোভাবেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তথা গঙ্গা নদীর ওপর নির্ভরশীল অঞ্চলের জন্য যথেষ্ট নয়। এ কারণে গড়াই-মধুমতী নদী ব্যবস্থাসহ এ অঞ্চলের প্রায় সব নদীতে মিঠাপানির স্বল্পতার জন্য লবণাক্ততা ঢুকে পড়ছে।
বাস্তব পরিস্থিতি:
- দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে
- কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে
- সুপেয় পানির সংকট তীব্র
- সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত
২০২৬: গঙ্গা চুক্তি নবায়ন—কী হবে?
গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, যা ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হবে, শেখ হাসিনার ২০১৭, ২০১৯ এবং ২০২২ সালের ভারত সফরের সময় আলোচনা করা হয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য খুব সামান্য কিছু অর্জিত হয়েছে।
চুক্তির নবায়ন ২০২৬-এ এসে উভয় দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের চাওয়া:
- বর্তমান চুক্তির সংশোধন—আরও পানি
- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনা
- শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম পানি প্রবাহের গ্যারান্টি
পর্ব ৩: ৫৪টি অভিন্ন নদী—পানি কূটনীতির জটিলতা
সংখ্যায় বাস্তবতা
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। কিন্তু চুক্তি হয়েছে মাত্র দুটি নদীতে: গঙ্গা (১৯৯৬) এবং কুশিয়ারা (২০২২)।
এখন পর্যন্ত কেবল দুটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে—১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি এবং ২০২২ সালের কুশিয়ারা চুক্তি।
বাকি ৫২টি নদী নিয়ে কোনো চুক্তি নেই। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ:
- তিস্তা
- ব্রহ্মপুত্র (যমুনা)
- মহানন্দা
- ডু/দহগ্রাম
- মনু
- খোয়াই
জয়েন্ট রিভার কমিশন (JRC): কাগজে-কলমে
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশন (JRC) একটি দ্বিপক্ষীয় সংস্থা যা অভিন্ন নদী সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু JRC-এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বছরের পর বছর বৈঠক হয়, আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তব সমাধান আসে না।
পর্ব ৪: আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের অবস্থান
আন্তর্জাতিক পানি আইনের মূল নীতি
আন্তর্জাতিক পানি আইন, যেমন ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের কনভেনশন, ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার, উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা এবং তথ্য ভাগাভাগির মতো নীতির উপর জোর দেয়।
মূল নীতিসমূহ:
১. ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার (Equitable and Reasonable Utilization)
প্রতিটি অববাহিকা রাষ্ট্র নদীর পানি ন্যায্যভাবে ব্যবহারের অধিকার রাখে।
২. উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা (No Significant Harm)
উজানের দেশ এমন কিছু করতে পারবে না যা ভাটির দেশে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করে।
৩. পূর্ব বিজ্ঞপ্তি ও পরামর্শ (Prior Notification and Consultation)
কোনো প্রকল্প শুরুর আগে প্রতিবেশী দেশকে জানাতে হবে এবং পরামর্শ নিতে হবে।
৪. তথ্য আদান-প্রদান (Information Sharing)
নদীর পানি প্রবাহ, গুণমান, ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য শেয়ার করতে হবে।
ভারত কি আন্তর্জাতিক আইন মানছে?
প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়:
১. ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজ: বাংলাদেশকে পূর্ব পরামর্শ ছাড়াই নির্মিত।
২. পানি প্রত্যাহার: শুষ্ক মৌসুমে একতরফা পানি আটকে রাখা বাংলাদেশে “উল্লেখযোগ্য ক্ষতি” করছে।
৩. তথ্য আদান-প্রদান: রিয়েল-টাইম ডেটা শেয়ারিং অপ্রতুল।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিকল্প
১. দ্বিপক্ষীয় আলোচনা (যা চলছে, কিন্তু ফলপ্রসূ নয়)
২. আন্তর্জাতিক সালিশ/মধ্যস্থতা
বাংলাদেশ চাইলে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যেতে পারে (যেমন: ICJ, PCA), কিন্তু এটি সম্পর্কের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ।
৩. তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা
জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক বা অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা মধ্যস্থতা করতে পারে।
৪. জনমত সৃষ্টি
আন্তর্জাতিক মিডিয়া, মানবাধিকার সংস্থা, পরিবেশবাদী গ্রুপের মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরি।
পর্ব ৫: জলবায়ু পরিবর্তন—নতুন চ্যালেঞ্জ
হিমবাহ গলনের প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, যা নদীর প্রবাহ প্যাটার্নকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমছে এবং বর্ষায় বন্যা বাড়ছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি:
- হিমবাহ সম্পূর্ণ গললে নদীর প্রবাহ আরও কমবে
- অনিয়মিত বৃষ্টিপাত—কখনো খরা, কখনো বন্যা
- লবণাক্ততা বৃদ্ধি
পানি সংকট বাড়বে, দ্বন্দ্বও
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে পানির চাহিদা আরও বাড়বে এবং সরবরাহ কমবে। এটি বাংলাদেশ-ভারত পানি সংকট আরও তীব্র করতে পারে।
পর্ব ৬: ২০২৬—কী হতে পারে? সম্ভাব্য দৃশ্যপট
দৃশ্যপট ১: Status Quo অব্যাহত (সবচেয়ে সম্ভাব্য)
- গঙ্গা চুক্তি নবায়ন হয় একই শর্তে বা সামান্য পরিবর্তনে
- তিস্তা চুক্তি হয় না (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায়)
- বাংলাদেশের পানি সংকট অব্যাহত থাকে
- দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টান অব্যাহত
দৃশ্যপট ২: আংশিক অগ্রগতি (আশাবাদী)
- গঙ্গা চুক্তি নবায়ন হয় বাংলাদেশের জন্য কিছুটা বেশি পানি প্রবাহ নিশ্চিত করে
- তিস্তায় অন্তত একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি হয় (যেমন: শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত)
- JRC-এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি
- আরও ২-৩টি ছোট নদীতে চুক্তি
দৃশ্যপট ৩: উল্লেখযোগ্য সমাধান (আদর্শ, কিন্তু অসম্ভাব্য)
- তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত (৫০:৫০ বণ্টন বা ৪৫:৪৫, ১০% পরিবেশের জন্য)
- গঙ্গা চুক্তি সংশোধিত—বাংলাদেশ আরও পানি পায়
- সব ৫৪টি নদীর জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি
- যৌথ ব্যবস্থাপনা, রিয়েল-টাইম ডেটা শেয়ারিং
- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় যৌথ পরিকল্পনা
দৃশ্যপট ৪: সম্পর্ক অবনতি (নেতিবাচক)
- গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নিয়ে অচলাবস্থা
- তিস্তা চুক্তি আরও দূরে সরে যায়
- বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সালিশে যাওয়ার বিবেচনা করে
- দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে শীতলতা
পর্ব ৭: সমাধানের পথ—বাংলাদেশের করণীয়
দীর্ঘমেয়াদী কৌশল
১. কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো
- আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা
- জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, ADB-এর মাধ্যমে চাপ
- মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করা
২. বহুপাক্ষিক প্রক্রিয়া
- SAARC, BIMSTEC-এর মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে উত্থাপন
- তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতা (যেমন: চীন, যুক্তরাষ্ট্র)
৩. অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি
- পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা
- বৃষ্টির পানি ধরে রাখার অবকাঠামো
- ভূগর্ভস্থ পানির যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার
- লবণ-সহিষ্ণু ফসলের উন্নয়ন
৪. জনগণকে সচেতন করা
- পানি সংকট সম্পর্কে জাতীয় সচেতনতা
- তৃণমূল থেকে আন্দোলন (যেমন তিস্তা আন্দোলন)
৫. পশ্চিমবঙ্গের সাথে সরাসরি যোগাযোগ
ভারতীয় ফেডারেল কাঠামোতে, রাজ্যের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের সাথে আলোচনা করতে পারে—সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে।
৬. চীন ফ্যাক্টর
চীন ব্রহ্মপুত্র নদীর উজানে। চীনের সাথে সমন্বয় করে বাংলাদেশ একটি ব্যালান্স তৈরি করতে পারে (যদিও এটি ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলবে)।
স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ
২০২৬ গঙ্গা চুক্তি নবায়নের জন্য:
১. আগাম প্রস্তুতি—ডেটা, রিসার্চ, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মতামত সংগ্রহ ২. ভারতের নতুন সরকারের সাথে (যদি পরিবর্তন হয়) দ্রুত সম্পর্ক স্থাপন ৩. পানির পরিমাণ বাড়ানোর জন্য দৃঢ় অবস্থান ৪. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি
তিস্তার জন্য:
১. পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী (যদি ২০২৬ সালে নির্বাচন হয়) এর সাথে সংলাপ ২. আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো ৩. অন্তত একটি অন্তর্বর্তী সমাধান চাওয়া
উপসংহার: পানি—সহযোগিতার সেতু, নাকি সংঘাতের কারণ?
পানি শুধু H₂O নয়—এটি জীবন, সভ্যতা, অর্থনীতি, রাজনীতি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি সমস্যা শুধু একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক।
আমরা কি নিরপেক্ষ ছিলাম?
আমরা চেষ্টা করেছি। আমরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পানি সংকটের কথা উল্লেখ করেছি। আমরা স্বীকার করেছি তিস্তার ক্যাচমেন্ট এরিয়ার ৮৩% ভারতে। কিন্তু একই সাথে, আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি:
১. বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার রয়েছে—আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী
২. ভারতের একতরফা পদক্ষেপ বাংলাদেশে মানবিক সংকট তৈরি করেছে—লক্ষ লক্ষ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত
৩. রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির অভাব—তিস্তা চুক্তি ১৪ বছর ধরে ঝুলে আছে শুধুমাত্র একজন রাজ্য নেত্রীর বিরোধিতায়
৪. ২০২৬ একটি সুযোগ—গঙ্গা চুক্তি নবায়ন ও তিস্তা চুক্তির জন্য
বাংলাদেশের জনগণের প্রতি:
পানি আমাদের অধিকার। তিস্তা, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র—এসব নদী আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে বাংলার মাটিতে প্রবাহিত। আমরা শুধু ন্যায্য হিস্সা চাই, বেশি নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে, পানি সংকট আরও বাড়বে। ২০২৬ সালে, আমাদের সরকার যেন দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে।
ভারতের জনগণের প্রতি:
বাংলাদেশ আপনাদের শত্রু নয়, বন্ধু। আমরা একসাথে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারি। পানি ভাগাভাগি একটি জিরো-সাম গেম নয়—দুই দেশই লাভবান হতে পারে যৌথ ব্যবস্থাপনায়। পশ্চিমবঙ্গের জনগণ, আপনারাও তিস্তার পানির উপর নির্ভরশীল, আমরা জানি। কিন্তু আমাদের ভাই-বোনেরাও। একটি ন্যায্য সমাধান সম্ভব—যদি রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি:
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। পানি সংকট এই সমস্যাকে আরও তীব্র করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, ADB—আপনারা মধ্যস্থতা করতে পারেন। পানি একটি মানবাধিকার। ১৭ কোটি মানুষের অধিকার উপেক্ষা করা যায় না।
২০২৬ সাল হতে পারে:
- সহযোগিতার নতুন অধ্যায়
- অথবা নীরব সংকটের আরেকটি দশক
সিদ্ধান্ত নেতাদের হাতে। কিন্তু জনগণের চাপ, সচেতনতা, আন্দোলন—এসব ইতিহাস বদলাতে পারে।
তিস্তা ও গঙ্গা শুধু নদী নয়—এগুলো বাংলাদেশের মানুষের জীবনরেখা। ২০২৬ সালে, এই জীবনরেখা রক্ষার লড়াই চূড়ান্ত পর্যায়ে যাবে।
আমরা আশাবাদী, কিন্তু বাস্তববাদীও। সমাধান সহজ হবে না, কিন্তু অসম্ভবও নয়।
“যখন দুটি দেশ একটি নদী ভাগ করে, তারা হয় শত্রু হতে পারে, অথবা সহযোগী। পানি হতে পারে সংঘাতের কারণ, অথবা সহযোগিতার সেতু। পছন্দটা আমাদের।”
মূল শব্দ: তিস্তা নদী, গঙ্গা চুক্তি, ভারত বাংলাদেশ পানি বিরোধ, ফারাক্কা ব্যারাজ, গজলডোবা ব্যারাজ, ২০২৬ গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, অভিন্ন নদী, পানি কূটনীতি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আন্তর্জাতিক পানি আইন, জলবায়ু পরিবর্তন, AAOIFI standards, যৌথ নদী কমিশন