ব্যাংকার্স সিলেকশন সিনিয়র অফিসার (সাধারণ) এর শেষ সময়ের টোটকা প্রস্তুতি – Financial and Banking Knowledge

Contents hide
11 ১১. ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১

১. বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যাবলি ও দায়িত্ব

মূল আইনি কাঠামো

বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২ (President’s Order No. 127 of 1972) অনুযায়ী ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে কার্যকর, আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, কিন্তু অপারেশন শুরু হয় পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের ঢাকা শাখা থেকে দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে।

প্রধান কার্যাবলি (আদেশের ধারা অনুযায়ী)

১.১ মুদ্রা ইস্যু ও ব্যবস্থাপনা (Note Issue Function)

আইনি ভিত্তি: বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২-এর ধারা ৩৭

প্রক্রিয়া:

  • বাংলাদেশ ব্যাংক একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার নোট ইস্যু করার একচেটিয়া অধিকার আছে
  • ২ টাকা মূল্যমানের নোট ছাড়া সব নোট বাংলাদেশ ব্যাংক ইস্যু করে (২ টাকার নোট সরকার ইস্যু করে)
  • বর্তমান প্রচলিত নোট: ২, ৫, ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০, ৫০০, ১০০০ টাকা

মিনিমাম রিজার্ভ সিস্টেম (Minimum Reserve System):

প্রয়োজনীয় রিজার্ভ = নোট ইস্যুর ন্যূনতম ৪০%
(যার মধ্যে):
- স্বর্ণ থাকতে হবে: ন্যূনতম ২০ কোটি টাকার সমপরিমাণ
- বৈদেশিক মুদ্রা/সিকিউরিটিজ থাকতে হবে: বাকি অংশ

বর্তমান পরিসংখ্যান (এপ্রিল ২০২৬):

  • মোট নোট সঞ্চালনে: প্রায় ২.৮৮ লাখ কোটি টাকা
  • মুদ্রা সংকোচন হার: ৮.৫% (২০২৫-২৬ মুদ্রানীতি অনুযায়ী)

১.২ সরকারের ব্যাংকার (Banker to the Government)

কাজের ধরন:

  • সরকারি তহবিল সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা
  • সরকারের পক্ষে ট্রেজারি বিল ও বন্ড ইস্যু এবং বিক্রয়
  • সরকারের পাবলিক ডেট ম্যানেজমেন্ট (Public Debt Management)
  • বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন পরিচালনা
  • সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বেতন-ভাতা বিতরণ ব্যবস্থাপনা

সাম্প্রতিক উদাহরণ:

  • ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১,৩২,৩৯৫ কোটি টাকা ধার্য (অর্থমন্ত্রণালয়ের বাজেট ডকুমেন্ট)

১.৩ ব্যাংকসমূহের ব্যাংক (Banker’s Bank)

ক্লিয়ারিং হাউজ পরিচালনা:

ক্লিয়ারিং পদ্ধতিপ্রতিদিনের গড় লেনদেনসময়সীমা
Bangladesh Electronic Funds Transfer Network (BEFTN)৪.৫ লাখ লেনদেনT+0
Real Time Gross Settlement (RTGS)১৮,০০০ লেনদেনরিয়েল টাইম
Bangladesh Automated Clearing House (BACH)২.২ লাখ চেক ক্লিয়ারিংT+1

জরুরি তারল্য সহায়তা:

  • লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট (Lender of Last Resort) হিসেবে কাজ করে
  • ডিসকাউন্ট উইন্ডো সুবিধা (Discount Window Facility)
  • স্পেশাল রিপো ফ্যাসিলিটি (বর্তমান রেট: ৮.৫০%)

১.৪ ক্রেডিট নিয়ন্ত্রণ (Credit Control)

পরিমাণগত নিয়ন্ত্রণ (Quantitative Controls):

ব্যাংক রেট (Bank Rate):

  • সংজ্ঞা: যে হারে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়
  • বর্তমান হার: ৮.০% (মার্চ ২০২৬ থেকে)
  • শেষ পরিবর্তন: জানুয়ারি ২০২৬ (৭.৫% থেকে ৮.০%)

খোলাবাজার কার্যক্রম (Open Market Operations):

  • ট্রেজারি বিল/বন্ড ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণ
  • বর্তমান ট্রেজারি বিল রেট: ৯১ দিন — ৭.৮৫%, ১৮২ দিন — ৮.২০%, ৩৬৪ দিন — ৮.৭৫%

গুণগত নিয়ন্ত্রণ (Qualitative Controls):

  • সিলেক্টিভ ক্রেডিট কন্ট্রোল: নির্দিষ্ট খাতে ঋণ সীমিতকরণ
  • মোরাল সুয়েশন: নৈতিক উপদেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ
  • ডাইরেক্ট অ্যাকশন: লাইসেন্স বাতিল বা জরিমানা

সেক্টরাল ক্রেডিট টার্গেট (২০২৫-২৬):

খাতমোট ঋণের শতাংশন্যূনতম ঋণ বৃদ্ধি হার
কৃষি১৪.৫%৯.০%
এসএমই২৩.০%১০.৫%
নারী উদ্যোক্তা৫.০%১২.০%

১.৫ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা (Foreign Exchange Management)

আইনি ভিত্তি: বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২

প্রধান দায়িত্ব:

  • বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা (বর্তমান রিজার্ভ: প্রায় ২০.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, BPM6 অনুযায়ী)
  • এক্সচেঞ্জ রেট স্থিতিশীলতা রক্ষা
  • অথরাইজড ডিলার (AD) লাইসেন্স প্রদান ও নিয়ন্ত্রণ
  • রেমিট্যান্স প্রবাহ মনিটরিং (২০২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আয়: ২৪.৮ বিলিয়ন ডলার)

ক্রলিং পেগ সিস্টেম (২০২৪ থেকে কার্যকর):

  • ডলারের রেট ধীরে ধীরে সমন্বয়ের ব্যবস্থা
  • মার্কেট মেকানিজমের সাথে সমন্বয় রেখে দৈনিক রেট নির্ধারণ
  • বর্তমান রেঞ্জ: ১ ডলার = ১১৭-১২০ টাকা (মে ২০২৬)

১.৬ আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা (Financial Stability)

সুপারভিশন ও রেগুলেশন:

  • অন-সাইট পরিদর্শন: বছরে ন্যূনতম ১ বার প্রতি ব্যাংকে
  • অফ-সাইট মনিটরিং: মাসিক/ত্রৈমাসিক রিটার্ন বিশ্লেষণ
  • ক্যামেল রেটিং (CAMEL Rating): Capital, Asset, Management, Earnings, Liquidity

সিস্টেমিক রিস্ক ম্যানেজমেন্ট:

  • ম্যাক্রো-প্রুডেনশিয়াল পলিসি (Macro-Prudential Policy)
  • স্ট্রেস টেস্টিং: বছরে ২ বার সব ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক
  • ডিপোজিট ইনসিউরেন্স স্কিম: ডিপোজিট ইনসিউরেন্স ট্রাস্ট ফান্ড (প্রতি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা সুরক্ষিত)

১.৭ উন্নয়নমূলক কাজ (Developmental Functions)

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion):

  • এজেন্ট ব্যাংকিং: ২০,৮০০+ এজেন্ট পয়েন্ট (২০২৫)
  • স্কুল ব্যাংকিং প্রোগ্রাম: ৩.৮ মিলিয়ন অ্যাকাউন্ট
  • কৃষক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: ১০ টাকায় অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা

ডিজিটাল ব্যাংকিং:

  • মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS): ১৮ কোটি+ অ্যাকাউন্ট
  • ইন্টারনেট ব্যাংকিং: ৮৫ লাখ সক্রিয় ব্যবহারকারী
  • ডিজিটাল পেমেন্ট: প্রতিদিন ৫.৫ কোটি টাকা লেনদেন

২. সিআরআর (CRR) এবং এসএলআর (SLR)

২.১ ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (CRR)

সংজ্ঞা: বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের মোট চাহিদা ও মেয়াদি দায় (Demand and Time Liabilities – DTL) এর যে শতাংশ নগদ আকারে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে বাধ্য, তাকে CRR বলে।

আইনি ভিত্তি: বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২-এর ধারা ৩৩

বর্তমান হার (মে ২০২৬):

CRR = ৫.৫০% (দৈনিক ভিত্তিতে)
CRR = ৫.০০% (দ্বি-সাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে)

ঐতিহাসিক পরিবর্তন:

তারিখCRR হারকারণ
জানুয়ারি ২০২৩৪.০%মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
এপ্রিল ২০২৪৫.০%অতিরিক্ত তারল্য শোষণ
জুলাই ২০২৫৫.৫০%বাজারে টাকার সরবরাহ কমানো
জানুয়ারি ২০২৬৫.৫০%একই রাখা হয়

গণনা পদ্ধতি:

DTL (Demand and Time Liabilities) এর মধ্যে পড়ে:
১. সেভিংস ডিপোজিট
২. কারেন্ট ডিপোজিট
৩. ফিক্সড ডিপোজিট
৪. রিকারিং ডিপোজিট
৫. অন্যান্য সময়সীমা আমানত

DTL এর মধ্যে পড়ে না:
১. শেয়ার ক্যাপিটাল
২. রিজার্ভ ও সারপ্লাস
৩. ইন্টার-ব্যাংক বোরোইং (৬ মাসের বেশি)
৪. বৈদেশিক মুদ্রা দায়

উদাহরণ গণনা:
একটি ব্যাংকের DTL = ১০,০০০ কোটি টাকা
CRR @ ৫.৫% = ১০,০০০ × ০.০৫৫ = ৫৫০ কোটি টাকা
(এই ৫৫০ কোটি টাকা ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখবে)

CRR-এর উদ্দেশ্য: ১. তারল্য নিয়ন্ত্রণ: বাজারে অতিরিক্ত টাকা শোষণ করে ইনফ্লেশন কমানো ২. আমানতকারীদের সুরক্ষা: জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংক যেন টাকা ফেরত দিতে পারে ৩. ক্রেডিট মাল্টিপ্লায়ার নিয়ন্ত্রণ: ব্যাংক কতটুকু ঋণ দিতে পারবে তা নিয়ন্ত্রণ

ক্রেডিট মাল্টিপ্লায়ার সূত্র:

Credit Multiplier = 1 / CRR

CRR = ৫.৫% হলে, Multiplier = 1/0.055 = ১৮.১৮

অর্থাৎ, ১০০ টাকা আমানত থেকে ব্যাংক সিস্টেম ১,৮১৮ টাকা ঋণ তৈরি করতে পারে (তাত্ত্বিকভাবে)

CRR রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি:

  • প্রতি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি CRR Account রাখে
  • প্রতি কর্মদিবসে DTL-এর উপর ভিত্তি করে জমা রাখতে হয়
  • দ্বি-সাপ্তাহিক (বৃহস্পতিবার থেকে পরবর্তী বুধবার) গড় হার ৫.০% থাকতে হবে
  • যদি CRR কম থাকে, তাহলে পেনাল্টি সুদ ধার্য করা হয় (ব্যাংক রেট + ২%)

২.২ স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রেশিও (SLR)

সংজ্ঞা: বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের মোট DTL-এর যে শতাংশ তারল্য সম্পদ (Liquid Assets) আকারে রাখতে বাধ্য, তাকে SLR বলে।

আইনি ভিত্তি: ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ধারা ২৫

বর্তমান হার (মে ২০২৬):

SLR = ১৩.০০% (সাধারণ ব্যাংকের জন্য)
SLR = ৫.৫০% (ইসলামী ব্যাংকের জন্য — কারণ তারা সুদভিত্তিক সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে না)

তারল্য সম্পদের সংজ্ঞা (Liquid Assets): ১. নগদ টাকা: হাতে থাকা ক্যাশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা ২. গোল্ড: স্বর্ণের বার বা কয়েন ৩. আনএনকাম্বার্ড সরকারি সিকিউরিটিজ:

  • ট্রেজারি বিল (৯১, ১৮২, ৩৬৪ দিন)
  • ট্রেজারি বন্ড (২, ৫, ১০, ১৫, ২০ বছর মেয়াদি)
  • বাংলাদেশ ব্যাংক বিল ৪. আনএনকাম্বার্ড অনুমোদিত সিকিউরিটিজ: সরকার অনুমোদিত অন্যান্য বন্ড

SLR গণনা উদাহরণ:

একটি ব্যাংকের:
- DTL = ১০,০০০ কোটি টাকা
- SLR @ ১৩% = ১০,০০০ × ০.১৩ = ১,৩০০ কোটি টাকা

এর মধ্যে থাকতে পারে:
- নগদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা: ৬৫০ কোটি (CRR ৫৫০ + অতিরিক্ত ১০০)
- সরকারি ট্রেজারি বিল: ৪০০ কোটি
- সরকারি বন্ড: ২৫০ কোটি
মোট = ১,৩০০ কোটি টাকা (SLR পূরণ হলো)

SLR-এর উদ্দেশ্য: ১. ব্যাংকের সলভেন্সি নিশ্চিতকরণ: জরুরি মুহূর্তে ব্যাংক যেন তারল্য সংকটে না পড়ে ২. সরকারের ঋণ চাহিদা পূরণ: ব্যাংকগুলোকে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা ৩. ঋণের উপর নিয়ন্ত্রণ: ব্যাংক যেন সব টাকা ঋণ দিয়ে না ফেলে, একটা অংশ নিরাপদ সম্পদে রাখে

CRR ও SLR-এর পার্থক্য:

বিষয়CRRSLR
জমা রাখার স্থানবাংলাদেশ ব্যাংকে বাধ্যতামূলকনিজের ভল্টে বা সরকারি বন্ডে
আইনি ভিত্তিবাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১
সুদ পাওয়া যায় কি?না (সুদবিহীন)হ্যাঁ (ট্রেজারি বিল/বন্ডে সুদ পাওয়া যায়)
প্রধান উদ্দেশ্যমুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণব্যাংকের তারল্য নিশ্চিত করা
বর্তমান হার৫.৫০%১৩.০০%
পরিবর্তনের ফ্রিকোয়েন্সিবেশি (প্রতি মুদ্রানীতিতে)কম (দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল)

নন-কমপ্লায়েন্সের শাস্তি:

  • CRR ঘাটতি: পেনাল্টি সুদ = ব্যাংক রেট + ২% (অর্থাৎ ১০% বর্তমানে)
  • SLR ঘাটতি: সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ব্যাখ্যা দিতে হয়, বারবার লঙ্ঘনে লাইসেন্স বাতিল পর্যন্ত হতে পারে

৩. রেপো (Repo) এবং রিভার্স রেপো রেট (Reverse Repo Rate)

৩.১ রেপো রেট (Repurchase Agreement Rate)

সংজ্ঞা: রেপো হলো স্বল্পমেয়াদি ঋণচুক্তি যেখানে বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের সরকারি সিকিউরিটিজ (ট্রেজারি বিল/বন্ড) বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রয় করে এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর আবার কিনে নেওয়ার চুক্তি করে। যে সুদ হারে এই লেনদেন হয়, তাকে রেপো রেট বলে।

বর্তমান রেট (মে ২০২৬):

Repo Rate = ৮.৫০%
(জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর, পূর্বে ৭.৭৫%)

রেপো চুক্তির প্রক্রিয়া:

ধাপ ১: ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে
      ↓
ধাপ ২: ব্যাংক ১০০ কোটি টাকার ট্রেজারি বিল নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে যায়
      ↓
ধাপ ৩: বাংলাদেশ ব্যাংক ৯৫ কোটি টাকা ঋণ দেয় (৫% হেয়ারকাট)
      ↓
ধাপ ৪: ৭ দিন পর ব্যাংক ৯৫ কোটি + সুদ (৮.৫০% হারে) ফেরত দেয়
      ↓
ধাপ ৫: বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেজারি বিল ফেরত দেয়

রেপো চুক্তির মেয়াদ:

  • ওভারনাইট রেপো: ১ দিন
  • টার্ম রেপো: ৭ দিন, ১৪ দিন, ২৮ দিন
  • বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত: ৭ দিন মেয়াদি রেপো

রেপো রেট বৃদ্ধির প্রভাব: ১. ঋণের খরচ বাড়ে: ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হয় ২. বাজারে টাকার সরবরাহ কমে: ব্যাংকগুলো কম ঋণ নিলে বাজারে তারল্য হ্রাস পায় ৩. মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত হয়: কম টাকা প্রচলনে থাকলে দাম বৃদ্ধি কমে ৪. লেন্ডিং রেট বাড়ে: ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি সুদ নেয়

ঐতিহাসিক Repo Rate পরিবর্তন:

তারিখরেপো রেটমুদ্রাস্ফীতি (ঐ সময়ে)কারণ
জুলাই ২০২২৬.০০%৭.৫%অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার
জানুয়ারি ২০২৩৬.৫০%৮.৭%মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুরু
জুলাই ২০২৩৭.২৫%৯.৯%তীব্র মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলা
জানুয়ারি ২০২৪৭.৭৫%৯.৫%রিজার্ভ সুরক্ষা
জুলাই ২০২৪৮.০০%৯.৭%আরও কড়া নীতি
জানুয়ারি ২০২৫৮.২৫%৯.২%স্থিতিশীলতা আনয়ন
জুলাই ২০২৫৮.৫০%৮.৮%একই রাখা হয়
জানুয়ারি ২০২৬৮.৫০%৮.৫%একই রাখা হয়

৩.২ রিভার্স রেপো রেট (Reverse Repo Rate)

সংজ্ঞা: রিভার্স রেপো হলো রেপোর উল্টো প্রক্রিয়া। এখানে বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের অতিরিক্ত তারল্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখে এবং সরকারি সিকিউরিটিজ কিনে নেয়। মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সিকিউরিটিজ ফেরত কিনে নেয় এবং সুদসহ টাকা ফেরত দেয়। এই সুদের হারকে রিভার্স রেপো রেট বলে।

বর্তমান রেট (মে ২০২৬):

Reverse Repo Rate = ৬.৫০%
(রেপো রেট থেকে ২% কম — স্ট্যান্ডিং করিডোর)

রিভার্স রেপো প্রক্রিয়া:

ধাপ ১: ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ৫০ কোটি টাকা আছে
      ↓
ধাপ ২: ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি বিল ৫০ কোটি টাকায় কিনে নেয়
      ↓
ধাপ ৩: ৭ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০ কোটি + সুদ (৬.৫০% হারে) দিয়ে বিল কিনে নেয়
      ↓
ধাপ ৪: ব্যাংক ৬.৫০% সুদ পায় অতিরিক্ত তারল্যের উপর

রিভার্স রেপো রেট হ্রাসের প্রভাব: ১. ব্যাংক তারল্য জমা রাখতে নিরুৎসাহিত হয়: কম সুদ পাওয়ায় ব্যাংক বাজারে ঋণ দিতে উৎসাহিত হয় ২. বাজারে তারল্য বৃদ্ধি পায়: ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা না রেখে বাজারে ছাড়ে ৩. লেন্ডিং রেট কমে: বেশি টাকা প্রচলনে এলে ব্যাংক সুদের হার কমায় ৪. অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ে: সহজ ঋণ পাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়

৩.৩ রেপো করিডোর (Repo Corridor)

সংজ্ঞা: রেপো রেট ও রিভার্স রেপো রেটের মধ্যবর্তী ব্যবধানকে স্ট্যান্ডিং করিডোর (Standing Corridor) বলে।

বর্তমান করিডোর:

রেপো রেট (উপরের সীমা): ৮.৫০%
     ↑
     | করিডোর = ২.০০%
     ↓
রিভার্স রেপো রেট (নিচের সীমা): ৬.৫০%

করিডোরের উদ্দেশ্য: ১. ইন্টারব্যাংক সুদের হার নিয়ন্ত্রণ: কল মানি রেট এই দুই সীমার মধ্যে ওঠানামা করে ২. মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা: অতিরিক্ত ওঠানামা প্রতিরোধ ৩. পলিসি সিগন্যালিং: বাজারকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া

২০২৫-২৬-এর মুদ্রানীতি লক্ষ্য:

সূচকলক্ষ্যবর্তমান অবস্থান (মার্চ ২০২৬)
মুদ্রাস্ফীতি৭.৫% (জুন ২০২৬)৮.৫%
M2 (ব্রড মানি) বৃদ্ধি৯.৮%১০.২%
প্রাইভেট সেক্টর ক্রেডিট বৃদ্ধি১০.৫%৯.৮%
বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ২৪ বিলিয়ন USD২০.৫ বিলিয়ন USD

৪. ব্যাংক রেট এবং কল মানি রেট

৪.১ ব্যাংক রেট (Bank Rate)

সংজ্ঞা: ব্যাংক রেট হলো সেই সুদের হার যা বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের সিকিউরিটিজ বা বিল অব এক্সচেঞ্জ পুনঃছাড়করণ (Rediscounting) করার বিপরীতে ঋণ প্রদান করে।

বর্তমান ব্যাংক রেট (মে ২০২৬):

Bank Rate = ৮.০০%

ব্যাংক রেট বনাম রেপো রেটের পার্থক্য:

বিষয়ব্যাংক রেটরেপো রেট
লেনদেনের ধরনবিল/সিকিউরিটিজ বিক্রয় (চূড়ান্ত)সিকিউরিটিজ বিক্রয় (পুনঃক্রয় চুক্তিসহ)
মেয়াদদীর্ঘমেয়াদি (১৫-৯০ দিন)স্বল্পমেয়াদি (১-২৮ দিন)
ব্যবহারবিল ডিসকাউন্টিং/পুনঃছাড়করণদৈনিক তারল্য ব্যবস্থাপনা
প্রভাবদীর্ঘমেয়াদি ঋণ নীতিতে প্রভাবস্বল্পমেয়াদি মুদ্রাবাজারে প্রভাব

ব্যাংক রেটের ব্যবহার: ১. রি-ডিসকাউন্টিং: ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া বিল অব এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ব্যাংকে পুনঃছাড়করণ করাতে পারে ২. দীর্ঘমেয়াদি ঋণ: যখন ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি তারল্য সংকট থাকে ৩. পেনাল্টি রেট: CRR/SLR ঘাটতির ক্ষেত্রে পেনাল্টি সুদ = ব্যাংক রেট + ২%

উদাহরণ:

একটি ব্যাংক তার গ্রাহকের কাছ থেকে ১ কোটি টাকার বিল অব এক্সচেঞ্জ (৯০ দিন মেয়াদি) নিয়েছে ৭.৫% সুদে ডিসকাউন্ট করে।

ব্যাংক এই বিল বাংলাদেশ ব্যাংকে পুনঃছাড়করণ করাতে চায় ৮% ব্যাংক রেটে।

প্রাপ্ত অর্থ = ১,০০,০০,০০০ - (১,০০,০০,০০০ × ০.০৮ × ৯০/৩৬৫)
            = ১,০০,০০,০০০ - ১,৯৭,২৬০
            = ৯৮,০২,৭৪০ টাকা

৪.২ কল মানি রেট (Call Money Rate)

সংজ্ঞা: কল মানি রেট হলো সেই সুদের হার যে হারে ব্যাংকগুলো একে অপরের কাছ থেকে অতি স্বল্পমেয়াদি (১ দিন-১৪ দিন) ঋণ নেয় বা দেয়।

বাংলাদেশে কল মানি মার্কেটের বৈশিষ্ট্য:

  • মেয়াদ: ওভারনাইট (১ দিন) থেকে ১৪ দিন
  • প্রধান অংশগ্রহণকারী: তফসিলি ব্যাংক, প্রাথমিক ডিলার
  • নিরাপত্তা: কোনো জামানত ছাড়াই (Unsecured)
  • নিয়ন্ত্রণ: রেপো করিডোরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে

বর্তমান কল মানি রেট পরিস্থিতি (এপ্রিল ২০২৬):

গড় কল মানি রেট: ৭.৮৫%
সর্বোচ্চ: ৮.৪০%
সর্বনিম্ন: ৬.৭০%
দৈনিক গড় লেনদেন: ৪,২০০ কোটি টাকা

কল মানি রেট নির্ধারণকারী ফ্যাক্টর: ১. তারল্য অবস্থা: যদি বাজারে অতিরিক্ত টাকা থাকে, রেট কমে ২. সিআরআর/এসএলআর রক্ষণাবেক্ষণ: সপ্তাহের শেষে রিজার্ভ পূরণে চাপ থাকলে রেট বাড়ে ৩. সরকারি খরচ: যখন সরকার বেতন-ভাতা দেয়, বাজারে তারল্য বাড়ে, রেট কমে ৪. রেপো করিডোর: রেট কখনো ৮.৫০%-এর উপরে বা ৬.৫০%-এর নিচে যায় না

কল মানি লেনদেন প্রক্রিয়া:

সকাল ১০টা: ব্যাংক A-এর ২০০ কোটি টাকা ঘাটতি, ব্যাংক B-এর ১৫০ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত

ব্যাংক A ফোন করে ব্যাংক B-কে → "১৫০ কোটি টাকা চাই, ওভারনাইট, রেট কত?"
ব্যাংক B জবাব দেয় → "৭.৮% দিতে পারি"
ব্যাংক A রাজি হয় → লেনদেন সম্পন্ন

পরদিন সকাল: ব্যাংক A ফেরত দেয় ১৫০ কোটি + সুদ
সুদ = ১৫০,০০,০০,০০০ × ০.০৭৮ × ১/৩৬৫ = ৩,২,০৫৫ টাকা

কল মানি বনাম নোটিস মানি:

বিষয়কল মানিনোটিস মানি
মেয়াদ১ দিন২-১৪ দিন
নোটিশপ্রয়োজন নেই১ দিনের নোটিশ প্রয়োজন
রেটসাধারণত কমকিছুটা বেশি

রেগুলেটরি লিমিট:

  • একটি ব্যাংক তার নেট ওর্থের সর্বোচ্চ ৫০% কল মানিতে ধার নিতে পারে
  • একটি ব্যাংক তার নেট ওর্থের সর্বোচ্চ ৪০% কল মানিতে ধার দিতে পারে
  • এই নিয়ম ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশন দ্বারা নির্ধারিত

৫. শ্রেণীকৃত ঋণ বা খেলাপি ঋণ (NPL)

৫.১ খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা ও শ্রেণীবিন্যাস

আইনি ভিত্তি: বাংলাদেশ ব্যাংকের Prudential Regulations for Banks – BRPD Circular No. 14/2012 এবং পরবর্তী সংশোধনী

খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা: যে ঋণের মূলধন, সুদ বা উভয়ই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হয়নি এবং যা ৯০ দিন বা তার বেশি সময় ধরে অতিবাহিত (Overdue) হয়েছে, তাকে খেলাপি ঋণ (Non-Performing Loan – NPL) বলে।

৫.২ ঋণ শ্রেণীকরণ

১. অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য ঋণ (Continuous Loan): যেসব ঋণের নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই (যেমন ওভারড্রাফট, ক্যাশ ক্রেডিট):

শ্রেণীসময়সীমাপ্রভিশনিং হারবৈশিষ্ট্য
Unclassified (UC)নিয়মিত১% (Standard) / ০.২৫% (SMA)নিয়মিত লেনদেন চলছে
Special Mention Account (SMA)অনিয়মিত কিন্তু ৯০ দিন অতিক্রম করেনি০.২৫%-৫%সতর্কতামূলক শ্রেণী
Substandard (SS)নিয়মিত লেনদেন বন্ধ ৩ মাস২০%প্রাথমিক খেলাপি
Doubtful (DF)নিয়মিত লেনদেন বন্ধ ৬ মাস৫০%মধ্যম খেলাপি
Bad/Loss (BL)নিয়মিত লেনদেন বন্ধ ৯ মাস১০০%সম্পূর্ণ খেলাপি

২. মেয়াদি ঋণ (Term Loan): যেসব ঋণের নির্দিষ্ট মেয়াদ ও পরিশোধ সূচি আছে:

শ্রেণীসময়সীমাপ্রভিশনিং হার
Unclassified (UC)কিস্তি পরিশোধে ৬ মাস বিলম্ব পর্যন্ত১%
Substandard (SS)কিস্তি পরিশোধে ৬-৯ মাস বিলম্ব২০%
Doubtful (DF)কিস্তি পরিশোধে ৯-১২ মাস বিলম্ব৫০%
Bad/Loss (BL)কিস্তি পরিশোধে ১২ মাসের বেশি বিলম্ব১০০%

৩. স্বল্পমেয়াদি কৃষি ঋণ:

শ্রেণীসময়সীমাপ্রভিশনিং হার
Unclassifiedবকেয়া ১২ মাস পর্যন্ত১%
Substandardবকেয়া ১২-৩৬ মাস৫%
Doubtfulবকেয়া ৩৬-৬০ মাস৫%
Bad/Lossবকেয়া ৬০ মাসের বেশি১০০%

৪. ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ঋণ:

শ্রেণীসময়সীমাপ্রভিশনিং হার
Unclassifiedবকেয়া ৬ মাস পর্যন্ত১%
Substandardবকেয়া ৬-১২ মাস২৫%
Doubtfulবকেয়া ১২-১৮ মাস২৫%
Bad/Lossবকেয়া ১৮ মাসের বেশি১০০%

৫.৩ বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান (ডিসেম্বর ২০২৫):

মোট ঋণ: ১৬,৮৫,৩২০ কোটি টাকা
খেলাপি ঋণ: ১,৮২,৩৯৫ কোটি টাকা
NPL অনুপাত: ১০.৮৩%

ব্যাংকওয়ারি খেলাপি ঋণ বিতরণ (ডিসেম্বর ২০২৫):

ব্যাংকের ধরনমোট ঋণ (কোটি টাকা)খেলাপি ঋণ (কোটি টাকা)NPL (%)
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক৩,২৫,৮৯০৮২,৪৫০২৫.৩০%
বিশেষায়িত ব্যাংক১,৪৮,২২০৪৬,২৮০৩১.২২%
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক৯,৮৫,৬৭০৪৫,৮৯০৪.৬৫%
বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক১,২৫,৫৪০৭,৭৭৫৬.১৯%

শীর্ষ ১০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার তালিকা (২০২৫): বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ৬ মাসে শীর্ষ খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের তালিকা প্রকাশ করে। কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:

  • হলমার্ক গ্রুপ: ৫,৫০০ কোটি টাকা
  • বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি: ৪,৫০০ কোটি টাকা
  • ক্রিসেন্ট গ্রুপ: ৩,২০০ কোটি টাকা

৫.৪ খেলাপি ঋণের কারণ

ঋণগ্রহীতার দিক থেকে: ১. ব্যবসায়িক ব্যর্থতা: বাজারে চাহিদা হ্রাস, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ২. প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় (বিশেষত কৃষি ঋণে) ৩. ইচ্ছাকৃত খেলাপি (Willful Defaulter): সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ না করা ৪. ডাইভার্সন অব ফান্ড: ঋণের অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার

ব্যাংকের দিক থেকে: ১. দুর্বল ক্রেডিট অ্যাপ্রেইজাল: ঋণ মঞ্জুরির আগে সঠিক মূল্যায়নের অভাব ২. রাজনৈতিক চাপ: প্রভাবশালীদের ঋণ দিতে বাধ্য হওয়া ৩. মনিটরিং ব্যর্থতা: ঋণ দেওয়ার পর নিয়মিত তদারকির অভাব ৪. দুর্নীতি: ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশে ঋণ মঞ্জুর

নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দিক থেকে: ১. দুর্বল আইনি পরিবেশ: আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ২. ঋণ আদায় আইনের অকার্যকারিতা: Artha Rin Adalat Act ১৯০৩-এর সীমাবদ্ধতা ৩. দুর্নীতিপ্রবণ সিস্টেম: ঋণ মওকুফ চাপ

৫.৫ প্রভিশনিং (Provisioning)

সংজ্ঞা: ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণের বিপরীতে যে অর্থ সংরক্ষণ করে রাখে, তাকে প্রভিশন বলে।

প্রভিশনিং গণনা উদাহরণ:

একটি ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিও:
১. Standard ঋণ: ১০,০০০ কোটি → প্রভিশন ১% = ১০০ কোটি
২. SMA ঋণ: ৫০০ কোটি → প্রভিশন ০.২৫% = ১.২৫ কোটি
৩. Substandard: ৩০০ কোটি → প্রভিশন ২০% = ৬০ কোটি
৪. Doubtful: ২০০ কোটি → প্রভিশন ৫০% = ১০০ কোটি
৫. Bad/Loss: ৫০০ কোটি → প্রভিশন ১০০% = ৫০০ কোটি

মোট প্রভিশন প্রয়োজন = ১০০ + ১.২৫ + ৬০ + ১০০ + ৫০০ = ৭৬১.২৫ কোটি টাকা

প্রভিশন শর্টফলের প্রভাব:

  • ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়
  • শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড কমে
  • রেগুলেটরি ক্যাপিটাল (Capital Adequacy) কমে
  • বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জরিমানা হতে পারে

৫.৬ খেলাপি ঋণ আদায়ের পদ্ধতি

আইনি পদ্ধতি: ১. ঋণ আদালত আইন ২০০৩ (Artha Rin Adalat Ain): বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের ২. দেউলিয়া আইন ১৯৯৭: ঋণগ্রহীতাকে দেউলিয়া ঘোষণা ৩. সম্পত্তি জব্দকরণ: জামানত হিসেবে রাখা সম্পত্তি বিক্রয়

বিকল্প পদ্ধতি: ১. রি-স্কিডিউলিং: ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো ২. রি-স্ট্রাকচারিং: ঋণের শর্ত পুনর্বিন্যাস ৩. সেটেলমেন্ট: মূল পাওনার কিছু অংশ (৫০-৮০%) নিয়ে আপস ৪. রাইট-অফ: ঋণ সম্পূর্ণ বাতিল করা (শেষ অবলম্বন)

বাংলাদেশে ঋণ আদায়ের সফলতার হার:

  • আদালত থেকে আদায়: মোট খেলাপি ঋণের ১২-১৫%
  • সেটেলমেন্টের মাধ্যমে: ২৫-৩০%
  • রাইট-অফ: ৪০-৪৫% (যা কার্যত অপূরণীয়)

৫.৭ খেলাপি ঋণের অর্থনৈতিক প্রভাব

ব্যাংকিং সেক্টরে: ১. মুনাফা হ্রাস: অর্জিত সুদ পাওয়া যায় না, প্রভিশন রাখতে হয় ২. নতুন ঋণ দিতে অক্ষমতা: খেলাপি ঋণ থেকে টাকা আটকে যায় ৩. ক্যাপিটাল ইরোশন: মূলধন ঘাটতি দেখা দেয় ৪. বাজার আস্থা হ্রাস: বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়

সামষ্টিক অর্থনীতিতে: ১. অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হ্রাস: ব্যাংক ঋণ দিতে না পারলে বিনিয়োগ কমে ২. সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বেইল-আউট করতে হয় ৩. মুদ্রাস্ফীতি: সরকার যদি নতুন টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক রিক্যাপিটালাইজ করে ৪. জনগণের ক্ষতি: আমানতকারীদের সুদ কমে

সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগ: ১. ব্যাংক ফান্ড এক্ট ২০২৩: ঋণ আদায়ে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান ২. ডিজিটাল ক্রেডিট বিউরো: সব ঋণগ্রহীতার তথ্য একত্রীকরণ (CIB Online System) ৩. ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (CIB): ঋণগ্রহীতার সম্পূর্ণ ইতিহাস সংরক্ষণ ৪. ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন: ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধি বাধ্যতামূলক করা

সিনিয়র অফিসার (সাধারণ) পদে ২২০০০-৫৩০৬০ টাকা স্কেলে বেতন পাবেন কেউ চাকরি পেলে
সিনিয়র অফিসার (সাধারণ) পদে ২২০০০-৫৩০৬০ টাকা স্কেলে বেতন পাবেন কেউ চাকরি পেলে

৬. বাংলাদেশের ব্যাংকিং কাঠামো

৬.১ তফসিলি ব্যাংক (Scheduled Banks)

সংজ্ঞা: বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২-এর ধারা ৩৭(২) অনুযায়ী, যে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলে (Schedule) অন্তর্ভুক্ত এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে, তাদের তফসিলি ব্যাংক বলে।

তফসিলভুক্ত হওয়ার শর্ত: ১. পরিশোধিত মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল (Paid-up Capital + Reserves): ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা (১৯৭২ সালের নিয়ম, বর্তমানে অনেক বেশি) ২. ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর সব শর্ত পূরণ ৩. বাংলাদেশ ব্যাংকের সন্তোষজনক ক্যামেল রেটিং ৪. আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সক্ষম

তফসিলি ব্যাংকের সুবিধা:

  • বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লিয়ারিং সদস্য হওয়া
  • রেপো/রিভার্স রেপো সুবিধা পাওয়া
  • ডিসকাউন্ট উইন্ডো ব্যবহার করতে পারা
  • CRR/SLR এর নিয়মের আওতায় থাকা (এটি দায় এবং সুবিধা উভয়ই)

৬.২ বাংলাদেশের ব্যাংক শ্রেণীবিভাগ (মে ২০২৬)

ক. রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক (State-Owned Commercial Banks – SCBs): মোট সংখ্যা: ৬টি

ব্যাংকের নামপ্রতিষ্ঠাশাখা সংখ্যা (২০২৫)মূলধন (কোটি টাকা)বিশেষত্ব
সোনালী ব্যাংক লিমিটেড১৯৭২১,২২০৮,৫০০বৃহত্তম ব্যাংক
জনতা ব্যাংক লিমিটেড১৯৭২৯১৫৬,২০০দ্বিতীয় বৃহত্তম
অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড১৯৭২৯৫৮৫,৮০০সবচেয়ে পুরোনো
রূপালী ব্যাংক লিমিটেড১৯৭২৫৮৫৩,৫০০পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংকের উত্তরসূরি
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (BDBL)২০১০৭৮২,২০০শিল্প ঋণে বিশেষায়িত
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক২০১৪৪৫৫১,৮০০গ্রামীণ ব্যাংকিং

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সমস্যা:

  • NPL রেট: গড়ে ২৫-৩১%
  • রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: ঋণ মঞ্জুরে স্বচ্ছতার অভাব
  • অতিরিক্ত জনবল: প্রতি শাখায় ২৫-৩০ জন কর্মী (বেসরকারিতে ১৫-২০)
  • প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা: Core Banking System-এ দুর্বলতা

খ. বিশেষায়িত ব্যাংক (Specialized Banks – SDBs): মোট সংখ্যা: ২টি

ব্যাংকের নামপ্রতিষ্ঠামূল উদ্দেশ্যশাখা সংখ্যাNPL (%)
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক১৯৭৩কৃষি ঋণ প্রদান১,১৯৫২৮.৫%
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (RAKUB)১৯৮৭উত্তরাঞ্চলে কৃষি উন্নয়ন৩৮৭২২.৮%

বিশেষ নোট: বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (BHBFC) এবং সমবায় ব্যাংক আগে বিশেষায়িত ব্যাংক ছিল, কিন্তু এখন আলাদা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

গ. বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক (Private Commercial Banks – PCBs): মোট সংখ্যা: ৪৩টি

প্রথম প্রজন্ম (১৯৮৩-১৯৯৯): ৮টি

  • আরব বাংলাদেশ ব্যাংক (১৯৮২)
  • উত্তরা ব্যাংক (১৯৮৫)
  • পূবালী ব্যাংক (১৯৯২)
  • ন্যাশনাল ব্যাংক (১৯৮৩)
  • ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (১৯৮৩)
  • ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (১৯৮৩) — বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক
  • আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক (১৯৯৫)
  • এক্সিম ব্যাংক (১৯৯৯)

দ্বিতীয় প্রজন্ম (১৯৯৯-২০০৮): ১২টি

  • ডাচ-বাংলা ব্যাংক (১৯৯৬) — ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে অগ্রগামী
  • ব্র্যাক ব্যাংক (২০০১)
  • ইস্টার্ন ব্যাংক (১৯৯২)
  • সাউথইস্ট ব্যাংক (১৯৯৫)
  • মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (১৯৯৯)
  • প্রাইম ব্যাংক (১৯৯৫)
  • স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক (১৯৯৯)

তৃতীয় প্রজন্ম (২০১৩-২০২০): ১০টি

  • মেঘনা ব্যাংক (২০১৩)
  • মিডল্যান্ড ব্যাংক (২০১৩)
  • পদ্মা ব্যাংক (২০১৩)
  • কমিউনিটি ব্যাংক (২০১৯)
  • সিটিজেন ব্যাংক (২০২০)

ইসলামী ব্যাংক: মোট ১০টি সম্পূর্ণ ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংক

ঘ. বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক (Foreign Commercial Banks): মোট সংখ্যা: ৯টি

ব্যাংকের নামদেশবাংলাদেশে প্রতিষ্ঠাশাখা সংখ্যা
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকযুক্তরাজ্য১৯৪৮
সিটি ব্যাংক এন.এ.যুক্তরাষ্ট্র১৯৯৫
হংকং সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন (HSBC)যুক্তরাজ্য১৯৯৬
কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনশ্রীলঙ্কা২০০৩
স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াভারত১৯৭৪
হাবিব ব্যাংক লিমিটেডপাকিস্তান১৯৭২
ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানপাকিস্তান১৯৫৩
ওরিয়েন্টাল কমার্শিয়াল জয়েন্ট স্টক ব্যাংকভিয়েতনাম২০১৯
ব্যাংক আল-ফালাহপাকিস্তান২০০৫

বিদেশি ব্যাংকের বৈশিষ্ট্য:

  • NPL রেট: ২-৬% (সবচেয়ে কম)
  • কর্পোরেট ব্যাংকিংয়ে মনোনিবেশ
  • ট্রেড ফাইন্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রায় বিশেষজ্ঞ
  • শাখা সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধতা (বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ)

৬.৩ অ-তফসিলি ব্যাংক (Non-Scheduled Banks)

সংজ্ঞা: যে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলে নেই, কিন্তু সীমিত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে।

বাংলাদেশে অ-তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা: ০ (শূন্য)

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

  • ১৯৭২-১৯৮৩: গ্রামীণ ব্যাংক অ-তফসিলি ছিল
  • ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক আইন পাস হলে এটি বিশেষ ব্যাংক হিসেবে কাজ শুরু করে (তফসিলি নয়, কিন্তু আলাদা আইনি কাঠামো)
  • বর্তমানে বাংলাদেশে সব ব্যাংকই তফসিলি

তফসিলি বনাম অ-তফসিলি পার্থক্য:

বিষয়তফসিলি ব্যাংকঅ-তফসিলি ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাঅন্তর্ভুক্তনেই
CRR/SLR বাধ্যবাধকতাআছেনেই
ক্লিয়ারিং সদস্যপদসদস্যসদস্য নয়
রেপো সুবিধাপায়পায় না
নিয়ন্ত্রণকঠোরতুলনামূলক শিথিল

৬.৪ ব্যাংকিং সেক্টরের বাজার কাঠামো (২০২৫)

ডিপোজিট (আমানত) মার্কেট শেয়ার:

ব্যাংকের ধরনমার্কেট শেয়ার (%)মোট আমানত (কোটি টাকা)
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক৬২.৫%১০,৮৫,০০০
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক২২.৮%৩,৯৬,০০০
বিশেষায়িত ব্যাংক৮.২%১,৪২,০০০
বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক৬.৫%১,১৩,০০০

ঋণ বিতরণ মার্কেট শেয়ার:

ব্যাংকের ধরনমার্কেট শেয়ার (%)মোট ঋণ (কোটি টাকা)
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক৫৮.৫%৯,৮৫,৬৭০
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক১৯.৩%৩,২৫,৮৯০
বিশেষায়িত ব্যাংক৮.৮%১,৪৮,২২০
বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক৭.৪%১,২৫,৫৪০
অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান৬.০%১,০০,০০০

৬.৫ ব্যাংকিং শিল্পের ট্রেন্ড

শাখা ভিত্তিক ব্যাংকিং হ্রাস:

  • ২০১৫: ৯,২০০ শাখা
  • ২০২০: ১০,৫০০ শাখা
  • ২০২৫: ১১,২০০ শাখা (মাত্র ৭% বৃদ্ধি)

ডিজিটাল ব্যাংকিং বৃদ্ধি:

  • মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট: ১৮.৫ কোটি (২০২৫)
  • এজেন্ট ব্যাংকিং পয়েন্ট: ২০,৮০০+
  • এটিএম বুথ: ১২,৮০০+
  • ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারী: ৮.৫ মিলিয়ন

মার্জার ও একীভূতকরণ:

  • ২০২১: ফার্মার্স ব্যাংক + গভর্নরস ব্যাংক = পদ্মা ব্যাংক
  • ২০২৩: আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক + ইউনিয়ন ব্যাংক (প্রস্তাবিত)

৭. মুদ্রানীতি (Monetary Policy)

৭.১ মুদ্রানীতির সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য

সংজ্ঞা: মুদ্রানীতি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই নীতি যার মাধ্যমে অর্থনীতিতে মুদ্রার সরবরাহ ও ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

প্রধান উদ্দেশ্য: ১. মূল্য স্থিতিশীলতা: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ (লক্ষ্য ৬.৫%-এর নিচে) ২. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: GDP বৃদ্ধিতে সহায়তা (লক্ষ্য ৬.৫-৭%) ৩. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: বেকারত্ব হ্রাস ৪. বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা: রিজার্ভ সংরক্ষণ ও টাকার মান রক্ষা ৫. আর্থিক স্থিতিশীলতা: ব্যাংকিং সিস্টেমের সুস্থতা রক্ষা

৭.২ মুদ্রানীতির ধরন

ক. সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি (Contractionary/Tight Monetary Policy)

সংজ্ঞা: যখন বাজারে অতিরিক্ত টাকার সরবরাহ কমিয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

কখন ব্যবহার করা হয়:

  • মুদ্রাস্ফীতি বেশি থাকলে (৮-১০%)
  • বাজারে অতিরিক্ত তারল্য থাকলে
  • আমদানি অতিরিক্ত বাড়লে এবং রিজার্ভ কমলে
  • সম্পদ বুদবুদ (Asset Bubble) তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকলে

প্রয়োগ পদ্ধতি: ১. CRR/SLR বৃদ্ধি: ব্যাংকের হাতে কম টাকা থাকবে ঋণ দেওয়ার জন্য ২. রেপো রেট বৃদ্ধি: ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হবে ৩. রিভার্স রেপো রেট বৃদ্ধি: ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে উৎসাহিত হবে ৪. ট্রেজারি বিল/বন্ড বিক্রয়: বাজার থেকে টাকা শোষণ ৫. সেক্টরাল ক্রেডিট সীমা: নির্দিষ্ট খাতে ঋণ সীমিতকরণ

বর্তমান উদাহরণ (২০২৩-২০২৬):

২০২৩ জানুয়ারি:
- মুদ্রাস্ফীতি: ৮.৭%
- রেপো রেট: ৬.৫% → ৭.২৫% (বৃদ্ধি)
- CRR: ৪.০% → ৫.০% (বৃদ্ধি)
উদ্দেশ্য: মুদ্রাস্ফীতি কমানো

২০২৪ জুলাই:
- মুদ্রাস্ফীতি: ৯.৭% (রেকর্ড উচ্চ)
- রেপো রেট: ৭.৭৫% → ৮.০০%
- CRR: ৫.০% → ৫.৫০%
ফলাফল: সংকোচনমূলক নীতি চলমান

প্রভাব: ✓ ইতিবাচক: মুদ্রাস্ফীতি কমে, টাকার মান বাড়ে ✗ নেতিবাচক: ঋণ ব্যয়বহুল হয়, বিনিয়োগ কমে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়

খ. সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি (Expansionary/Loose Monetary Policy)

সংজ্ঞা: যখন বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চাঙ্গা করা হয়।

কখন ব্যবহার করা হয়:

  • মুদ্রাস্ফীতি কম বা স্থিতিশীল (৫% বা তার নিচে)
  • অর্থনৈতিক মন্দা বা প্রবৃদ্ধি শ্লথ
  • বেকারত্ব বেশি
  • ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কম

প্রয়োগ পদ্ধতি: ১. CRR/SLR হ্রাস: ব্যাংকের হাতে বেশি টাকা থাকবে ঋণ দেওয়ার জন্য ২. রেপো রেট হ্রাস: ব্যাংক সহজে ও সস্তায় ঋণ নিতে পারবে ৩. রিভার্স রেপো রেট হ্রাস: ব্যাংক টাকা জমা না রেখে ঋণ দিতে উৎসাহিত হবে ৪. ট্রেজারি বিল/বন্ড ক্রয়: বাজারে টাকা ছাড়া ৫. সেক্টরাল ক্রেডিট উৎসাহ: অগ্রাধিকার খাতে ঋণ বৃদ্ধি

ঐতিহাসিক উদাহরণ (২০২০-২০২১):

২০২০ মার্চ (কোভিড-১৯ মহামারি):
- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: ৩.৫% (স্বাভাবিক ৭-৮%)
- রেপো রেট: ৬.৭৫% → ৫.৭৫% (হ্রাস)
- CRR: ৫.৫% → ৩.৫% (হ্রাস)
উদ্দেশ্য: অর্থনীতিতে তারল্য বৃদ্ধি, ব্যবসায়ীদের সাহায্য

ফলাফল:
- ২০২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি: ৬.৯% (পুনরুদ্ধার)
- কিন্তু ২০২২ থেকে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি শুরু

প্রভাব: ✓ ইতিবাচক: ঋণ সহজলভ্য, বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ✗ নেতিবাচক: মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি, সম্পদ মূল্য বৃদ্ধি (বুদবুদ)

৭.৩ বর্তমান মুদ্রানীতি (জানুয়ারি-জুন ২০২৬)

পলিসি স্ট্যান্স: Moderately Contractionary (মধ্যম সংকোচনমূলক)

প্রধান লক্ষ্যমাত্রা:

সূচকলক্ষ্য (জুন ২০২৬)বর্তমান অবস্থা (মার্চ ২০২৬)অগ্রগতি
মুদ্রাস্ফীতি৭.৫%৮.৫%পিছিয়ে
GDP প্রবৃদ্ধি৬.৭৫%৬.২% (প্রাক্কলিত)পিছিয়ে
বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধি১০.৫%৯.৮%পিছিয়ে
M2 (ব্রড মানি) বৃদ্ধি৯.৮%১০.২%লক্ষ্য অতিক্রম
নেট ডমেস্টিক এসেট (NDA)১১.৫%১২.৮%লক্ষ্য অতিক্রম
নেট ফরেন এসেট (NFA)৩.৫%-২.২%নেতিবাচক
রিজার্ভ (BPM6)২৪ বিলিয়ন USD২০.৫ বিলিয়ন USDপিছিয়ে

প্রধান পলিসি রেট (মে ২০২৬):

রেপো রেট (Repo): ৮.৫০%
রিভার্স রেপো রেট (Reverse Repo): ৬.৫০%
ব্যাংক রেট (Bank Rate): ৮.০০%
CRR: ৫.৫০%
SLR: ১৩.০০%

মুদ্রানীতি বিবৃতির ফ্রিকোয়েন্সি:

  • বছরে ২ বার: জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর
  • মিড-টার্ম রিভিউ: প্রতি ছয় মাসের মাঝামাঝি
  • বিশেষ পরিস্থিতিতে জরুরি পলিসি সংশোধন

৭.৪ মুদ্রানীতি ট্রান্সমিশন মেকানিজম

ট্রান্সমিশন চ্যানেলস:

১. সুদের হার চ্যানেল:

রেপো রেট বৃদ্ধি → ব্যাংকের ধার করার খরচ বাড়ে 
→ ব্যাংক লেন্ডিং রেট বাড়ায় 
→ ঋণগ্রহীতারা কম ঋণ নেয় 
→ বিনিয়োগ ও ভোগ কমে 
→ মুদ্রাস্ফীতি কমে

২. সম্পদ মূল্য চ্যানেল:

কঠোর মুদ্রানীতি → সুদ হার বৃদ্ধি 
→ স্টক ও রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ কমে 
→ সম্পদ মূল্য হ্রাস 
→ মানুষের সম্পদ কমে 
→ খরচ কমে 
→ মুদ্রাস্ফীতি কমে

৩. ক্রেডিট চ্যানেল:

CRR বৃদ্ধি → ব্যাংকের তারল্য কমে 
→ ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে 
→ ক্রেডিট সংকোচন 
→ বিনিয়োগ কমে 
→ মুদ্রাস্ফীতি কমে

৪. বিনিময় হার চ্যানেল:

রেপো রেট বৃদ্ধি → বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হয় 
→ ডলার আসে 
→ টাকার মূল্য বাড়ে 
→ আমদানি সস্তা হয় 
→ মুদ্রাস্ফীতি কমে

বাংলাদেশে ট্রান্সমিশন দুর্বলতার কারণ: ১. সুদ হার নিয়ন্ত্রণ: সরকারের ঋণ সুদ হার নির্ধারণ (৯% ক্যাপ ২০২০-২০২৩) ২. খেলাপি ঋণের উচ্চ হার: ব্যাংক নতুন ঋণ দিতে অনিচ্ছুক ৩. রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: নির্দেশিত ঋণ বিতরণ ৪. অপর্যাপ্ত আর্থিক বাজার: বন্ড মার্কেট অনুন্নত

৭.৫ মুদ্রানীতির চ্যালেঞ্জ (২০২৬)

১. মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বনাম প্রবৃদ্ধি:

  • মুদ্রাস্ফীতি ৮.৫% (লক্ষ্য ৬.৫%)
  • কঠোর নীতি প্রয়োজন, কিন্তু প্রবৃদ্ধি কমার ঝুঁকি

২. রিজার্ভ সংকট:

  • রিজার্ভ ২০.৫ বিলিয়ন USD (লক্ষ্য ২৪ বিলিয়ন)
  • আমদানি খরচ বেশি, রেমিট্যান্স কম

৩. খেলাপি ঋণ:

  • NPL ১০.৮৩% (উচ্চ)
  • ব্যাংক ঋণ দিতে অনিচ্ছুক, মুদ্রানীতি কার্যকর হয় না

৪. IMF প্রোগ্রাম:

  • ৪.৭ বিলিয়ন USD ঋণ চুক্তি (জানুয়ারি ২০২৩)
  • শর্ত: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ বৃদ্ধি, ব্যাংক সংস্কার

৮. ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (Electronic Payments)

৮.১ বেফটিন (BEFTN) — Bangladesh Electronic Funds Transfer Network

সংজ্ঞা: BEFTN হলো বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত একটি ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেম যার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে ইলেকট্রনিকভাবে অর্থ স্থানান্তর করা যায়।

প্রতিষ্ঠা: ২০১১ সালের জুন

পূর্ণরূপ: Bangladesh Electronic Funds Transfer Network

কার্যপদ্ধতি: BEFTN একটি Batch Processing System — অর্থাৎ দিনে নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে অনেক লেনদেন প্রসেস করা হয়।

ব্যাচ টাইমিং (২০২৬):

ব্যাচ নম্বরকাট-অফ টাইমসেটেলমেন্ট টাইমধরন
ব্যাচ ১সকাল ১০:০০দুপুর ১২:০০Credit & Debit
ব্যাচ ২দুপুর ১২:৩০বিকাল ০২:৩০Credit & Debit
ব্যাচ ৩বিকাল ০৩:০০বিকাল ০৫:০০Credit Only

লেনদেন সীমা:

  • সর্বনিম্ন: ১ টাকা
  • সর্বোচ্চ: ৫ লাখ টাকা (প্রতি লেনদেনে)
  • দৈনিক সীমা: ব্যাংক ভেদে ভিন্ন (সাধারণত ১০-২০ লাখ টাকা)

সুবিধা: ১. সস্তা: চার্জ ৫-২০ টাকা (ব্যাংক ভেদে) ২. নিরাপদ: এনক্রিপটেড নেটওয়ার্ক ৩. ব্যাপক: ৬১টি ব্যাংক সংযুক্ত ৪. সরকারি লেনদেন: বেতন, ভাতা, পেনশন প্রদান ৫. বাল্ক পেমেন্ট: একসাথে হাজার হাজার লেনদেন

অসুবিধা: ১. সময় লাগে: Same-day settlement (রিয়েল-টাইম নয়) ২. সীমিত ব্যাচ: দিনে মাত্র ৩টি ব্যাচ ৩. ছুটির দিন সীমাবদ্ধতা: সাপ্তাহিক ছুটিতে কাজ করে না

ব্যবহারের উদাহরণ:

  • সরকারি কর্মচারীদের বেতন
  • পেনশন বিতরণ
  • ইউটিলিটি বিল পরিশোধ
  • ব্যাংক থেকে ব্যাংকে নিয়মিত স্থানান্তর

পরিসংখ্যান (২০২৫):

দৈনিক গড় লেনদেন: ৪.৫ লাখ
দৈনিক গড় পরিমাণ: ৮,২০০ কোটি টাকা
বার্ষিক মোট লেনদেন: ১৬.৫ কোটি

৮.২ আরটিজিএস (RTGS) — Real Time Gross Settlement

সংজ্ঞা: RTGS হলো রিয়েল-টাইম পেমেন্ট সিস্টেম যেখানে লেনদেন তাৎক্ষণিকভাবে এবং একটি একটি করে (Gross Basis) সম্পন্ন হয়।

প্রতিষ্ঠা: ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল

পূর্ণরূপ: Real Time Gross Settlement

কার্যপদ্ধতি:

ধাপ ১: ব্যাংক A থেকে ১ কোটি টাকা পাঠানোর নির্দেশ
      ↓
ধাপ ২: RTGS সিস্টেম তাৎক্ষণিক ব্যাংক A-এর হিসাব চেক করে
      ↓
ধাপ ৩: যদি তারল্য থাকে, তাহলে ব্যাংক B-তে টাকা স্থানান্তর (৫-১০ মিনিট)
      ↓
ধাপ ৪: উভয় ব্যাংক কনফার্মেশন পায়

অপারেশনাল সময়:

কর্মদিবস: রবিবার-বৃহস্পতিবার
সময়: সকাল ৯:০০ — বিকাল ৩:০০ (শেষ লেনদেন গ্রহণ)
সেটেলমেন্ট: বিকাল ৪:৩০ পর্যন্ত

লেনদেন সীমা:

  • সর্বনিম্ন: ১ লাখ টাকা
  • সর্বোচ্চ: কোনো সীমা নেই
  • চার্জ: ১০০-৫০০ টাকা (ব্যাংক ভেদে, পরিমাণের উপর ভিত্তি করে)

সুবিধা: ১. তাৎক্ষণিক: ১০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন ২. বড় অঙ্কের জন্য: কোটি টাকা সুরক্ষিতভাবে পাঠানো যায় ৩. নিশ্চিত: Delivery vs Payment (DVP) — টাকা না কাটলে লেনদেন বাতিল ৪. ইরিভোকেবল: একবার সম্পন্ন হলে ফেরত নেওয়া যায় না (জালিয়াতি রোধ)

অসুবিধা: ১. ব্যয়বহুল: চার্জ বেশি ২. সীমিত সময়: বিকাল ৩টার পর কাজ করে না ৩. ন্যূনতম সীমা: ১ লাখ টাকার কম পাঠানো যায় না

ব্যবহারের উদাহরণ:

  • জমি ক্রয়ের মূল্য পরিশোধ
  • বড় ব্যবসায়িক লেনদেন
  • শেয়ার বাজারে সেটেলমেন্ট
  • ইন্টার-ব্যাংক লেনদেন

পরিসংখ্যান (২০২৫):

দৈনিক গড় লেনদেন: ১৮,০০০
দৈনিক গড় পরিমাণ: ১২,৫০০ কোটি টাকা
বার্ষিক মোট লেনদেন: ৪৫ লাখ

৮.৩ এনপিএসবি (NPSB) — National Payment Switch Bangladesh

সংজ্ঞা: NPSB হলো বাংলাদেশের জাতীয় পেমেন্ট সুইচ যার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম, পিওএস (Point of Sale) এবং ই-কমার্স নেটওয়ার্ক সংযুক্ত।

প্রতিষ্ঠা: ২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর

পূর্ণরূপ: National Payment Switch Bangladesh

পরিচালনা: বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)

সংযুক্ত সেবা: ১. এটিএম সুইচিং: যেকোনো ব্যাংকের কার্ড দিয়ে যেকোনো ব্যাংকের এটিএম ব্যবহার ২. পিওএস সুইচিং: দোকানে কার্ড দিয়ে পেমেন্ট ৩. ই-কমার্স পেমেন্ট: অনলাইন শপিং ৪. বিল পেমেন্ট: বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি বিল

লেনদেন সীমা:

সেবাদৈনিক সীমাপ্রতি লেনদেন চার্জ
এটিএম উত্তোলন৪০,০০০ টাকা১০-২০ টাকা (নিজের ব্যাংকের বাইরে)
পিওএস পেমেন্ট২ লাখ টাকা১-২% (ব্যবসায়ী বহন করে)
ই-কমার্স১ লাখ টাকা২-৩%

সংযুক্ত ব্যাংক: ৬৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

সংযুক্ত ডিভাইস (২০২৫):

এটিএম: ১২,৮০০+
পিওএস টার্মিনাল: ২,৮৫,০০০+
ই-কমার্স মার্চেন্ট: ৫,৫০০+

সুবিধা: ১. সুবিধাজনক: যেকোনো এটিএম ব্যবহার করা যায় ২. ক্যাশলেস লেনদেন: কার্ড দিয়ে সরাসরি পেমেন্ট ৩. নিরাপত্তা: PIN ও চিপ প্রযুক্তি ৪. ইন্টিগ্রেশন: সব ব্যাংক এক নেটওয়ার্কে

অসুবিধা: ১. ডাউনটাইম: মাঝেমধ্যে নেটওয়ার্ক ডাউন হয় ২. সাইবার ঝুঁকি: কার্ড ক্লোনিং, স্কিমিং ৩. এটিএম ক্যাশ-আউট: অনেক এটিএমে টাকা থাকে না

পরিসংখ্যান (২০২৫):

দৈনিক এটিএম লেনদেন: ১২ লাখ
দৈনিক পিওএস লেনদেন: ৩.৫ লাখ
মাসিক মোট লেনদেন পরিমাণ: ৪৫,০০০ কোটি টাকা

৮.৪ পেমেন্ট সিস্টেমের তুলনা

বৈশিষ্ট্যBEFTNRTGSNPSB
লেনদেনের ধরনব্যাচ (দিনে ৩ বার)রিয়েল-টাইমরিয়েল-টাইম
ন্যূনতম পরিমাণ১ টাকা১ লাখ টাকাকোনো সীমা নেই
সর্বোচ্চ পরিমাণ৫ লাখ টাকাকোনো সীমা নেইদৈনিক সীমা প্রযোজ্য
চার্জ৫-২০ টাকা১০০-৫০০ টাকা১০-২০ টাকা
সময়Same-day১০ মিনিটতাৎক্ষণিক
উপযুক্তবাল্ক পেমেন্ট, বেতনবড় লেনদেনখুচরা পেমেন্ট
অপারেশনাল সময়২৪/৭ (ব্যাচ সীমাবদ্ধ)সীমিত সময়২৪/৭

৮.৫ আসন্ন উন্নয়ন

ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম (Instant Payment System – IPS):

  • চালু: ২০২৬-২৭ (পরীক্ষামূলক)
  • বৈশিষ্ট্য: ২৪/৭ রিয়েল-টাইম, মোবাইল নম্বর দিয়ে পেমেন্ট
  • লক্ষ্য: ভারতের UPI-এর মতো সিস্টেম

বাংলাকিউআর (BanglaQR):

  • সব ব্যাংক ও MFS প্রোভাইডারের জন্য একক QR কোড
  • চালু: ২০২৫ (পাইলট চলছে)
  • উদ্দেশ্য: ক্যাশলেস লেনদেন বৃদ্ধি

৯. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (Foreign Exchange Reserves)

৯.১ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংজ্ঞা

সংজ্ঞা: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হলো একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে থাকা বিদেশি মুদ্রা (প্রধানত মার্কিন ডলার, ইউরো, পাউন্ড), স্বর্ণ, Special Drawing Rights (SDR) এবং IMF রিজার্ভ পজিশন।

বাংলাদেশের রিজার্ভের উপাদান: ১. বৈদেশিক মুদ্রা: মার্কিন ডলার (৮৫%), ইউরো (৮%), অন্যান্য (৭%) ২. স্বর্ণ: প্রায় ১৩.৭৫ মেট্রিক টন (বর্তমান মূল্য ~৮০০ মিলিয়ন USD) ৩. SDR (Special Drawing Rights): IMF থেকে বরাদ্দ (~১.৫ বিলিয়ন USD) ৪. IMF রিজার্ভ ট্র্যাঞ্চ: প্রায় ২০০ মিলিয়ন USD

৯.২ রিজার্ভ গণনার পদ্ধতি: BPM6

BPM6 কী? BPM6 = Balance of Payments and International Investment Position Manual, 6th Edition (IMF-এর নির্দেশিকা, ২০০৯)

বাংলাদেশে BPM6 প্রয়োগ: জুলাই ২০১৫ থেকে

BPM5 ও BPM6-এর পার্থক্য:

বিষয়BPM5 (পুরোনো)BPM6 (নতুন)
Liquid Assetsসব তরল সম্পদ গণনাশুধু সহজে রূপান্তরযোগ্য
Encumbered Assetsঅন্তর্ভুক্তবাদ দেওয়া হয়
Swaps/Forwardsঅন্তর্ভুক্তনেট পজিশন গণনা
EDF ঋণরিজার্ভে যোগদায় হিসেবে বিয়োগ

উদাহরণ গণনা (মার্চ ২০২৬):

BPM6 পদ্ধতিতে রিজার্ভ:

গ্রস রিজার্ভ (BPM5): ২৪.২ বিলিয়ন USD
বাদ যাবে:
- IMF-এর কাছে দায়: -১.২ বিলিয়ন
- EDF (Export Development Fund) দায়: -০.৮ বিলিয়ন
- কারেন্সি সোয়াপ নেট পজিশন: -০.৬ বিলিয়ন
- এনকাম্বার্ড অ্যাসেটস: -০.৫ বিলিয়ন
- অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি দায়: -০.৬ বিলিয়ন

নেট রিজার্ভ (BPM6) = ২৪.২ - ৩.৭ = ২০.৫ বিলিয়ন USD

বর্তমান রিজার্ভ (মে ২০২৬):

BPM6 পদ্ধতি: ২০.৫ বিলিয়ন USD
BPM5 পদ্ধতি: ২৪.২ বিলিয়ন USD
পার্থক্য: ৩.৭ বিলিয়ন USD (১৫.৩%)

৯.৩ রিজার্ভের গুরুত্ব

১. আমদানি পরিশোধ ক্ষমতা:

আমদানি কভারেজ = রিজার্ভ / মাসিক গড় আমদানি

বর্তমান (মে ২০২৬):
রিজার্ভ: ২০.৫ বিলিয়ন USD
মাসিক আমদানি: ৫.৮ বিলিয়ন USD
কভারেজ: ২০.৫ / ৫.৮ = ৩.৫ মাস

IMF প্রস্তাবিত: ন্যূনতম ৩ মাস (বাংলাদেশ পাস করেছে, কিন্তু সীমান্তে)

২. মুদ্রার মান রক্ষা:

  • রিজার্ভ কমলে টাকার মূল্য কমে (ডলারের দাম বাড়ে)
  • ২০২২ সালে রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন থেকে ৩২ বিলিয়নে নামলে ডলার ৮৬ টাকা থেকে ১১০ টাকায় গিয়েছিল

৩. বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ:

  • সরকার ও বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে রিজার্ভ ব্যবহৃত হয়
  • ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ: ৬.৮ বিলিয়ন USD

৪. আস্থা সৃষ্টি:

  • বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রিজার্ভ দেখে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা যাচাই করে

৯.৪ রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারণ (২০২২-২০২৬)

বাংলাদেশের রিজার্ভ ট্রেন্ড:

সময়রিজার্ভ (BPM6)পরিবর্তন
আগস্ট ২০২১৪৬.৪ বিলিয়ন USDসর্বোচ্চ
ডিসেম্বর ২০২২৩৩.৭ বিলিয়ন-১২.৭ বিলিয়ন
জুন ২০২৩৩০.২ বিলিয়ন-৩.৫ বিলিয়ন
ডিসেম্বর ২০২৩২৪.৮ বিলিয়ন-৫.৪ বিলিয়ন
জুন ২০২৪২১.২ বিলিয়ন-৩.৬ বিলিয়ন
ডিসেম্বর ২০২৪১৯.৮ বিলিয়ন-১.৪ বিলিয়ন
মে ২০২৬২০.৫ বিলিয়ন+০.৭ বিলিয়ন

প্রধান কারণ:

১. আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি:

২০২০-২১: ৬৫ বিলিয়ন USD
২০২১-২২: ৮৬ বিলিয়ন USD (+৩২%)
২০২২-২৩: ৭৮ বিলিয়ন USD (সংকোচন শুরু)
২০২৩-২৪: ৭২ বিলিয়ন USD
২০২৪-২৫: ৬৯ বিলিয়ন USD (প্রাক্কলিত)

কারণ:
- জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি (রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ)
- খাদ্যশস্য মূল্য বৃদ্ধি (বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট)
- মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি (পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল প্রকল্প)

২. রেমিট্যান্স হ্রাস (সাময়িক):

২০২০-২১: ২৪.৮ বিলিয়ন USD
২০২১-২২: ২১.০ বিলিয়ন USD (-১৫%)
২০২২-২৩: ২১.৯ বিলিয়ন USD
২০২৩-২৪: ২৩.৯ বিলিয়ন USD
২০২৪-২৫: ২৪.৮ বিলিয়ন USD (পুনরুদ্ধার)

কারণ:
- অফিশিয়াল চ্যানেলে ডলারের কম দাম (হুন্ডি আকর্ষণীয় ছিল)
- মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান হ্রাস

৩. রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মন্থর:

২০২০-২১: ৩৮.৮ বিলিয়ন USD
২০২১-২২: ৫২.১ বিলিয়ন USD (+৩৪%)
২০২২-২৩: ৫৫.৬ বিলিয়ন USD (+৬.৭%)
২০২৩-২৪: ৪৭.৪ বিলিয়ন USD (-১৫%)
২০২৪-২৫: ৫০.২ বিলিয়ন USD (পুনরুদ্ধার)

কারণ:
- বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা (ক্রেতা অর্ডার কমিয়েছে)
- ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্যের চাহিদা হ্রাস

৪. বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ:

২০২২-২৩: ৪.২ বিলিয়ন USD পরিশোধ
২০২৩-২৪: ৫.৮ বিলিয়ন USD পরিশোধ
২০২৪-২৫: ৬.৮ বিলিয়ন USD পরিশোধ (প্রাক্কলিত)
২০২৫-২৬: ৭.৫ বিলিয়ন USD পরিশোধ (প্রাক্কলিত)

৫. রিজার্ভ পরিমাপ পদ্ধতি পরিবর্তন (BPM6):

  • ২০১৫ সালে BPM6 চালু হলে রিজার্ভ গণনায় ৩-৪ বিলিয়ন USD কম দেখা যায়

৯.৫ রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের উপায়

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ (২০২৩-২০২৬):

১. আমদানি নিয়ন্ত্রণ:

  • বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে ১০০% মার্জিন (অগ্রিম পেমেন্ট)
  • গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স আমদানিতে LC বিধিনিষেধ

২. রেমিট্যান্স উৎসাহিতকরণ:

  • ২.৫% ইনসেন্টিভ (প্রতি ১০০ ডলারে ২.৫ ডলার বোনাস)
  • Offshore Banking Unit (OBU) দেশীয়করণ

৩. রপ্তানি বৃদ্ধি:

  • নতুন বাজার খোঁজা (আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা)
  • পণ্য বৈচিত্র্যকরণ (চামড়া, পাটজাত, ঔষধ)

৪. IMF সহায়তা:

  • ৪.৭ বিলিয়ন USD ঋণ চুক্তি (২০২৩-২৬)
  • ইতোমধ্যে পাওয়া: ১.৬ বিলিয়ন USD (৩টি কিস্তি)

৫. সোয়াপ চুক্তি:

  • চীনের সাথে ৭০০ মিলিয়ন USD সোয়াপ চুক্তি (২০২৪)

৯.৬ আদর্শ রিজার্ভ মাত্রা

IMF-এর Adequacy Ratio:

Adequate Reserves = (10% × M2) + (30% × Short-term Debt) + (10% × Other Liabilities) + (Import Cover × 3 months)

বাংলাদেশের জন্য (২০২৬):
= (১০% × ২০,০০০ কোটি USD) + (৩০% × ৮ বিলিয়ন) + (১০% × ৫ বিলিয়ন) + (৫.৮ × ৩)
= ২ + ২.৪ + ০.৫ + ১৭.৪
= ২২.৩ বিলিয়ন USD

বর্তমান রিজার্ভ: ২০.৫ বিলিয়ন
ঘাটতি: ১.৮ বিলিয়ন USD

১০. ইসলামী ব্যাংকিং (Islamic Banking Principles)

১০.১ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূলনীতি

মূল নিষেধাজ্ঞা: ১. রিবা (Riba): সুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ২. ঘরর (Gharar): অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা বা জুয়া নিষিদ্ধ ৩. মায়সির (Maysir): জুয়া বা ভাগ্যনির্ভর লেনদেন নিষিদ্ধ ৪. হারাম পণ্য: মদ, শূকর, জুয়া, পর্নোগ্রাফিতে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ

মূল বৈশিষ্ট্য:

  • রিস্ক শেয়ারিং: ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ে ঝুঁকি ভাগ করে
  • এসেট-ব্যাকড: প্রতিটি লেনদেন বাস্তব সম্পদের সাথে সংযুক্ত
  • শরিয়াহ বোর্ড: ইসলামী স্কলারদের তত্ত্বাবধান বাধ্যতামূলক

১০.২ ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতি

ক. মুদারাবা (Mudarabah)

সংজ্ঞা: মুদারাবা হলো একটি লাভ-লোকসান ভাগাভাগি চুক্তি যেখানে এক পক্ষ মূলধন সরবরাহ করে (Rab-ul-Mal) এবং অন্য পক্ষ পরিশ্রম ও দক্ষতা প্রদান করে (Mudarib)।

প্রকারভেদ: ১. মুদারাবা ডিপোজিট (Saving/Investment Account):

  • গ্রাহক মূলধনদাতা, ব্যাংক ব্যবস্থাপক
  • লাভ পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে ভাগ (যেমন ৬৫:৩৫)
  • লোকসান শুধু মূলধনদাতা বহন করে (যদি ব্যাংকে অবহেলা না থাকে)

২. মুদারাবা ফাইন্যান্সিং:

  • ব্যাংক মূলধনদাতা, গ্রাহক ব্যবস্থাপক
  • ব্যবসার লাভ ভাগাভাগি

উদাহরণ:

একজন গ্রাহক ১০ লাখ টাকা মুদারাবা সেভিংসে রাখল।
ব্যাংক সেই টাকা দিয়ে ব্যবসা করে ১ লাখ টাকা লাভ করল।

লাভ বন্টন চুক্তি: গ্রাহক ৬৫%, ব্যাংক ৩৫%
গ্রাহক পাবে: ১,০০,০০০ × ০.৬৫ = ৬৫,০০০ টাকা (৬.৫% রিটার্ন)
ব্যাংক পাবে: ১,০০,০০০ × ০.৩৫ = ৩৫,০০০ টাকা

যদি লোকসান হয় (ধরুন ৫০,০০০ টাকা):
গ্রাহক ফেরত পাবে: ১০,০০,০০০ - ৫০,০০০ = ৯,৫০,০০০ টাকা
ব্যাংক কিছু পাবে না (শুধু পরিশ্রম নষ্ট)

খ. মুশারাকা (Musharakah)

সংজ্ঞা: মুশারাকা হলো যৌথ উদ্যোগ চুক্তি যেখানে সব পক্ষ মূলধন ও ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখে এবং লাভ-লোকসান অনুপাতে ভাগ করে।

প্রকারভেদ: ১. স্থায়ী মুশারাকা (Permanent Musharakah): দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব ২. হ্রাসমান মুশারাকা (Diminishing Musharakah): ক্রমান্বয়ে ব্যাংকের অংশ কমে যায়

উদাহরণ — বাড়ি ক্রয়ে হ্রাসমান মুশারাকা:

একটি বাড়ির মূল্য: ১ কোটি টাকা
গ্রাহকের অগ্রিম: ২০ লাখ (২০%)
ব্যাংকের মূলধন: ৮০ লাখ (৮০%)

মাসিক কিস্তি:
১. মূলধন পরিশোধ: ৮০,০০,০০০ / ২০০ মাস = ৪০,০০০ টাকা
২. ভাড়া (ব্যাংকের অংশের): (৮০% × ১,০০,০০,০০০ × ০.০৮) / ১২ = ৫৩,৩৩৩ টাকা
মোট: ৪০,০০০ + ৫৩,৩৩৩ = ৯৩,৩৩৩ টাকা/মাস

প্রতি মাসে ব্যাংকের অংশ কমে:
১ম মাসের পর: ৮০% - ০.৪% = ৭৯.৬%
১০০ মাসের পর: ৮০% - ৪০% = ৪০%
২০০ মাসের পর: ০% (সম্পূর্ণ গ্রাহকের হয়ে যায়)

মুদারাবা বনাম মুশারাকা:

বিষয়মুদারাবামুশারাকা
মূলধনশুধু একপক্ষ দেয়সবাই দেয়
ব্যবস্থাপনাশুধু একপক্ষ করেসবাই করে
লোকসানের ভাগমূলধনদাতা বহন করেমূলধন অনুপাতে ভাগ
লাভের ভাগপূর্বনির্ধারিত অনুপাতেযেকোনো অনুপাতে

গ. মুরাবাহা (Murabaha)

সংজ্ঞা: মুরাবাহা হলো ক্রয়-বিক্রয় ভিত্তিক চুক্তি যেখানে ব্যাংক পণ্য কিনে গ্রাহকের কাছে লাভ যোগ করে বিক্রয় করে, এবং ক্রয়মূল্য ও লাভের পরিমাণ স্পষ্টভাবে জানানো হয়।

পদক্ষেপ:

ধাপ ১: গ্রাহক একটি গাড়ি কিনতে চায় (মূল্য ২০ লাখ টাকা)
      ↓
ধাপ ২: ব্যাংক শোরুম থেকে গাড়ি কিনে নেয় (২০ লাখ)
      ↓
ধাপ ৩: ব্যাংক গ্রাহককে অফার দেয় ২৫ লাখ টাকায় (লাভ ৫ লাখ)
      ↓
ধাপ ৪: গ্রাহক রাজি হলে ৩৬ মাসে কিস্তিতে পরিশোধ
      ↓
ধাপ ৫: গ্রাহক মাসিক ২৫,০০,০০০ / ৩৬ = ৬৯,৪৪৪ টাকা দেয়

শর্তাবলী:

  • গাড়ি প্রথমে ব্যাংকের মালিকানায় আসতে হবে (শুধু কাগজি নয়)
  • ক্রয়মূল্য ও লাভ স্পষ্ট জানাতে হবে
  • একবার চুক্তি হলে লাভ পরিবর্তন করা যায় না
  • গ্রাহক অগ্রিম পরিশোধ করলে ছাড় দেওয়া যায় (তবে বাধ্যতামূলক নয়)

বাংলাদেশে ব্যবহার:

  • ইসলামী ব্যাংকের ৭০-৮০% লেনদেন মুরাবাহা ভিত্তিক
  • গাড়ি, বাড়ি, কাঁচামাল ক্রয়ে ব্যবহৃত

ঘ. ইজারা (Ijarah)

সংজ্ঞা: ইজারা হলো ইসলামী লিজিং — ব্যাংক সম্পদ কিনে গ্রাহককে ভাড়া দেয়, মেয়াদ শেষে মালিকানা হস্তান্তরের অপশন থাকে।

প্রকারভেদ: ১. অপারেটিং ইজারা: মেয়াদ শেষে সম্পদ ব্যাংকের থাকে ২. ইজারা ওয়াল ইকতিনা: মেয়াদ শেষে গ্রাহক কিনে নিতে পারে

উদাহরণ:

একটি কারখানার যন্ত্র (মূল্য ১ কোটি টাকা)

ব্যাংক যন্ত্র কিনে ফেলে।
৫ বছরের ইজারা চুক্তি:
- মাসিক ভাড়া: ২ লাখ টাকা
- মোট ভাড়া: ২ × ৬০ = ১২০ লাখ টাকা
- মেয়াদ শেষে গ্রাহক ১ লাখ টাকা দিয়ে যন্ত্র কিনে নিতে পারবে

ঙ. সালাম (Salam)

সংজ্ঞা: সালাম হলো অগ্রিম মূল্য পরিশোধে ভবিষ্যতে পণ্য সরবরাহ — কৃষি পণ্যে বেশি ব্যবহৃত।

উদাহরণ:

একজন কৃষক ৬ মাস পর ১০ টন ধান দেবে।
ব্যাংক এখনই ৫ লাখ টাকা দেয় (বাজার দর ৬ লাখ)।
৬ মাস পর কৃষক ১০ টন ধান সরবরাহ করে।
ব্যাংক সেই ধান বাজারে বিক্রয় করে লাভ করে।

শর্ত:

  • পণ্যের গুণমান, পরিমাণ, সরবরাহের তারিখ স্পষ্ট থাকতে হবে
  • অর্থ সম্পূর্ণ অগ্রিম দিতে হবে
  • সরবরাহ ব্যর্থ হলে ক্ষতিপূরণ আছে

চ. ইস্তিসনা (Istisna)

সংজ্ঞা: ইস্তিসনা হলো অর্ডার-ভিত্তিক উৎপাদন চুক্তি — যেমন বাড়ি নির্মাণ, জাহাজ তৈরি।

উদাহরণ:

গ্রাহক একটি বাড়ি নির্মাণ করতে চায় (খরচ ৫০ লাখ)।
ব্যাংক নির্মাণকারীর সাথে চুক্তি করে ৫০ লাখে।
ব্যাংক গ্রাহকের কাছে বিক্রয় করে ৬০ লাখ টাকায়।
গ্রাহক ২ বছরে কিস্তিতে পরিশোধ করে।
নির্মাণ শেষে বাড়ি গ্রাহকের হয়ে যায়।

১০.৩ সাধারণ ব্যাংকিং বনাম ইসলামী ব্যাংকিং

বিষয়সাধারণ ব্যাংকিংইসলামী ব্যাংকিং
আয়ের উৎসসুদ (Interest)লাভ (Profit)
ঝুঁকিব্যাংক কম ঝুঁকি নেয়ব্যাংক ও গ্রাহক ভাগ করে
সম্পদ সংযোগপ্রয়োজন নেইবাধ্যতামূলক
গ্যারান্টিমূলধন ফেরত গ্যারান্টিডলোকসানে মূলধন কমতে পারে
রিটার্ননির্দিষ্ট সুদ হারলাভের অনুপাত (পরিবর্তনশীল)
SLR১৩% (সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ)৫.৫% (সুদভিত্তিক সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে না)

১০.৪ বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের পরিস্থিতি

ইসলামী ব্যাংকের সংখ্যা: ১০টি (সম্পূর্ণ শরিয়াহ ভিত্তিক) ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো: ২৫টি সাধারণ ব্যাংক ইসলামী শাখা পরিচালনা করে

মার্কেট শেয়ার (২০২৫):

মোট ব্যাংকিং সেক্টরে ইসলামী ব্যাংকিং:
ডিপোজিট: ২৮.৫%
ঋণ বিতরণ: ২৬.৮%
শাখা: ২২%

বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংক: ১. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (IBBL): শাখা ৩৬০+ ২. আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ৩. এক্সিম ব্যাংক ৪. সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৫. শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক

চ্যালেঞ্জ: ১. শরিয়াহ নন-কমপ্লায়েন্স: অনেক ব্যাংক প্রকৃত শরিয়াহ মানে না (নামেমাত্র ইসলামী) ২. দক্ষ শরিয়াহ স্কলারের অভাব: বাংলাদেশে যোগ্য স্কলার কম ৩. আইনি কাঠামো: ইসলামী ব্যাংকের জন্য আলাদা আইন নেই


১১. ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১

১১.১ আইনের পটভূমি ও উদ্দেশ্য

পূর্ণনাম: The Bank Company Act, 1991 (Act No. XIV of 1991)

কার্যকর: ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২

পূর্ববর্তী আইন:

  • Banking Companies Ordinance, 1962 (পাকিস্তান আমলের আইন)
  • বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নতুন ব্যাংকিং পরিবেশ অনুযায়ী সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়

মূল উদ্দেশ্য: ১. ব্যাংকিং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান ২. আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ৩. ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ৪. বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা সুনির্দিষ্টকরণ

১১.২ গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ

ধারা ২ — সংজ্ঞা (Definitions)

ব্যাংক কোম্পানি (Banking Company): যে কোম্পানি ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনা করে এবং যার প্রধান কাজ আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদান।

ব্যাংকিং (Banking):

  • আমানত গ্রহণ (যা চাহিবামাত্র বা অন্যভাবে পরিশোধযোগ্য)
  • চেক, ড্রাফট বা অন্যান্য মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের সুবিধা
  • ঋণ ও অগ্রিম প্রদান

ব্যাংকিং ব্যবসা নয় (Non-Banking Activities):

  • শুধু এজেন্সি কাজ
  • সমবায় সমিতি
  • চিট ফান্ড

ধারা ৫ — ব্যাংকিং লাইসেন্স (Banking License)

লাইসেন্স বাধ্যতামূলক: কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবসা করতে চাইলে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লাইসেন্স নিতে হবে।

লাইসেন্সের শর্ত (২০২৬ অনুযায়ী): ১. পরিশোধিত মূলধন:

  • নতুন ব্যাংক: ন্যূনতম ৪০০ কোটি টাকা
  • বিদেশি ব্যাংকের শাখা: ১৫০ কোটি টাকা ২. ব্যবসায়িক পরিকল্পনা: বিস্তারিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা জমা দিতে হবে ৩. উপযুক্ত পরিচালক: যোগ্য ও সৎ পরিচালক থাকতে হবে ৪. আর্থিক সামর্থ্য: স্পন্সরদের আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণ

লাইসেন্স বাতিলের কারণ:

  • মূলধন ঘাটতি (Capital Adequacy Ratio মানতে ব্যর্থতা)
  • বারবার আইন লঙ্ঘন
  • আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করা
  • দেউলিয়া অবস্থা

ধারা ৭ — পরিচালনা পর্ষদ (Board of Directors)

পরিচালকের সংখ্যা:

  • সর্বনিম্ন: ৫ জন
  • সর্বোচ্চ: ১৩ জন

স্বাধীন পরিচালক:

  • মোট পরিচালকের ন্যূনতম ২০% স্বাধীন পরিচালক হতে হবে
  • স্বাধীন পরিচালক = যিনি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার নন এবং স্পন্সরদের সাথে সম্পর্কিত নন

নিষিদ্ধ পরিচালক:

  • দেউলিয়া ব্যক্তি
  • খেলাপি ঋণগ্রহীতা
  • দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তি
  • অসুস্থ মস্তিষ্কের ব্যক্তি

পরিচালকের মেয়াদ: ৩ বছর (পুনঃনির্বাচনযোগ্য)

ধারা ১২ — ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগ (Appointment of MD)

MD নিয়োগ প্রক্রিয়া:

  • বোর্ড নিয়োগ দেয়, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগে
  • মেয়াদ: সর্বোচ্চ ৩ বছর (নবায়নযোগ্য)
  • ৬৫ বছরের বেশি বয়স হলে পদত্যাগ বাধ্যতামূলক

যোগ্যতা:

  • ব্যাংকিংয়ে ন্যূনতম ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা (বা সমমানের আর্থিক খাতে)
  • স্নাতকোত্তর ডিগ্রি
  • খেলাপি ঋণগ্রহীতা নন

ধারা ১৩ — ব্যাংকের নাম ব্যবহার (Use of Word “Bank”)

নিষেধাজ্ঞা: কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়া তার নামে “Bank”, “Banking”, “ব্যাংক” শব্দ ব্যবহার করতে পারবে না।

ব্যতিক্রম:

  • বাংলাদেশ ব্যাংক
  • বিশ্বব্যাংক (World Bank)
  • এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (Asian Development Bank)

শাস্তি: ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা

ধারা ১৮ — ঋণ সীমা (Credit Limit)

একক ঋণগ্রহীতা (Single Borrower):

  • সর্বোচ্চ সীমা: ব্যাংকের মোট মূলধনের (Tier-1 Capital) ১৫%
  • ব্যতিক্রম: জামানতসহ ২৫% পর্যন্ত (বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি সাপেক্ষে)

সংশ্লিষ্ট গ্রুপ (Connected Group):

  • সর্বোচ্চ সীমা: মোট মূলধনের ২৫%
  • সংশ্লিষ্ট গ্রুপ = একই পরিবার বা ব্যবসায়িক গ্রুপের সদস্য

উদাহরণ গণনা:

একটি ব্যাংকের Tier-1 Capital: ১,০০০ কোটি টাকা

একক ঋণগ্রহীতা সীমা:
- সাধারণ: ১,০০০ × ১৫% = ১৫০ কোটি টাকা
- জামানতসহ: ১,০০০ × ২৫% = ২৫০ কোটি টাকা

যদি একজন ব্যক্তি ৩০০ কোটি টাকা ঋণ চায়:
→ আইন লঙ্ঘন, অনুমোদন করা যাবে না

লঙ্ঘনের শাস্তি:

  • ব্যাংক জরিমানা: ঋণ অতিরিক্ত পরিমাণের ৫%
  • দায়ী কর্মকর্তা: কারাদণ্ড ৩ বছর বা জরিমানা ১০ লাখ টাকা

ধারা ২৫ — তারল্য সংরক্ষণ (Maintenance of Liquid Assets — SLR)

বিস্তারিত অংশ ৬.২-এ দেওয়া হয়েছে (SLR)

আইনি শর্ত:

  • প্রতিটি ব্যাংক তাদের DTL-এর নির্দিষ্ট শতাংশ তারল্য সম্পদে রাখবে
  • বর্তমান হার: ১৩% (সাধারণ ব্যাংক), ৫.৫% (ইসলামী ব্যাংক)

ধারা ২৭ — রিজার্ভ ফান্ড (Reserve Fund)

বাধ্যতামূলক রিজার্ভ: প্রতিটি ব্যাংক তার নিট লাভের ন্যূনতম ২০% রিজার্ভ ফান্ডে জমা রাখবে।

উদাহরণ:

একটি ব্যাংকের বার্ষিক নিট লাভ: ১০০ কোটি টাকা
রিজার্ভ ফান্ডে জমা: ১০০ × ২০% = ২০ কোটি টাকা
শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ডের জন্য: ৮০ কোটি টাকা

রিজার্ভ ব্যবহারের শর্ত:

  • শুধুমাত্র লোকসান পূরণ বা বোনাস শেয়ার ইস্যুতে ব্যবহার করা যায়
  • ডিভিডেন্ড দেওয়া যায় না

ধারা ৩৩ — পরিচালকদের ঋণ নিষেধাজ্ঞা (Loans to Directors)

নিষেধাজ্ঞা:

  • পরিচালক নিজে বা তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সুবিধাজনক শর্তে ঋণ নিতে পারবে না
  • পরিচালক ঋণ নিতে চাইলে পূর্ণ বোর্ড সভায় অনুমোদন লাগবে
  • সংশ্লিষ্ট পরিচালক ভোটদান করতে পারবে না

ব্যতিক্রম:

  • ঋণের শর্ত সাধারণ গ্রাহকের মতো হতে হবে
  • সুদের হার, জামানত, মেয়াদ — সব সাধারণ নিয়ম মানতে হবে

লঙ্ঘনের শাস্তি: পরিচালক পদ থেকে অপসারণ

ধারা ৩৬ — নিরীক্ষা (Audit)

বাহ্যিক নিরীক্ষক:

  • প্রতি বছর সাধারণ সভায় নিরীক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক
  • নিরীক্ষক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত তালিকা থেকে হতে হবে
  • একই নিরীক্ষক পরপর ৩ বছরের বেশি নিয়োগ দেওয়া যায় না

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা:

  • প্রতিটি শাখায় বছরে ন্যূনতম ১ বার অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা
  • ঝুঁকিপূর্ণ শাখায় ৬ মাসে ১ বার

ধারা ৪৫ — পরিদর্শন (Inspection by Bangladesh Bank)

বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা:

  • যেকোনো সময় যেকোনো ব্যাংক পরিদর্শন করতে পারে
  • সব রেকর্ড, নথি, হিসাব পরীক্ষা করার ক্ষমতা
  • কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অধিকার

পরিদর্শনের ফ্রিকোয়েন্সি:

  • ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক: বছরে ২ বার
  • সাধারণ ব্যাংক: বছরে ১ বার
  • সুস্থ ব্যাংক: ১৮ মাসে ১ বার

ধারা ৪৭ — বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা (Directives by Bangladesh Bank)

নির্দেশনার ক্ষেত্র: ১. মূলধন পর্যাপ্ততা বৃদ্ধি ২. ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ৩. খেলাপি ঋণ হ্রাস ৪. প্রভিশনিং বৃদ্ধি ৫. ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন (চরম ক্ষেত্রে)

মানতে ব্যর্থ হলে:

  • জরিমানা
  • লাইসেন্স স্থগিত
  • লাইসেন্স বাতিল (চূড়ান্ত পর্যায়ে)

১১.৩ সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী

সংশোধনী ২০১৩ (Bank Company (Amendment) Act, 2013)

প্রধান পরিবর্তন: ১. পরিচালক পদের মেয়াদ: ৯ বছর পর ৩ বছরের বিরতি বাধ্যতামূলক ২. স্বাধীন পরিচালক: ন্যূনতম ২০% স্বাধীন পরিচালক থাকতে হবে ৩. পরিচালকদের প্রশিক্ষণ: নতুন পরিচালকদের ৬ মাসের মধ্যে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক ৪. পরিবার সদস্য সীমা: একই পরিবারের সর্বোচ্চ ২ জন পরিচালক হতে পারবে

সংশোধনী ২০১৮

প্রধান পরিবর্তন: ১. পরিশোধিত মূলধন: নতুন ব্যাংকের জন্য ৪০০ কোটি টাকা (আগে ১০০ কোটি) ২. নন-এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান: চেয়ারম্যান দৈনিক পরিচালনায় জড়িত হতে পারবেন না ৩. অডিট কমিটি: সব ব্যাংকে অডিট কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক

সংশোধনী ২০২৩ (প্রস্তাবিত, আংশিক কার্যকর)

প্রস্তাবিত পরিবর্তন: ১. ঋণ সীমা কঠোরকরণ: একক ঋণগ্রহীতা সীমা ১৫% থেকে ১০%-এ কমানো ২. খেলাপি ঋণ পুনঃসংজ্ঞা: ৬০ দিন বকেয়া থাকলেই খেলাপি (আগে ৯০ দিন) ৩. স্বয়ংক্রিয় পেনাল্টি: ক্যাপিটাল ঘাটতিতে স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ৪. পরিচালকের শেয়ার লক-ইন: পরিচালক পদ থেকে সরে যাওয়ার ৫ বছর পর্যন্ত শেয়ার বিক্রয় নিষিদ্ধ


১২. ব্যাসেল-৩ (Basel III)

১২.১ ব্যাসেল কমিটি ও ব্যাসেল চুক্তির ইতিহাস

ব্যাসেল কমিটি কী? Basel Committee on Banking Supervision (BCBS) — ১৯৭৪ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরে গঠিত আন্তর্জাতিক ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ব্যাসেল চুক্তির ক্রমবিকাশ:

চুক্তিসালমূল ফোকাস
ব্যাসেল-১১৯৮৮ক্রেডিট রিস্ক ও ন্যূনতম মূলধন (৮% CAR)
ব্যাসেল-২২০০৪অপারেশনাল রিস্ক, মার্কেট রিস্ক যোগ
ব্যাসেল-৩২০১০ (২০০৮ আর্থিক সংকটের পর)মূলধন মান উন্নয়ন, তারল্য মান যোগ
ব্যাসেল-৪২০১৭ (পুরোপুরি কার্যকর ২০২৮)রিস্ক ওয়েট গণনায় সংশোধন

বাংলাদেশে প্রয়োগ:

  • ব্যাসেল-১: ১৯৯৬ সাল থেকে
  • ব্যাসেল-২: ২০১০ সাল থেকে
  • ব্যাসেল-৩: ২০১৫ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে (সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন লক্ষ্য ২০২৭)

১২.২ ব্যাসেল-৩-এর মূল উপাদান

ক. মূলধন পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy)

ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়াসি রেশিও (CAR) — Capital Adequacy Ratio:

CAR = (Tier-1 Capital + Tier-2 Capital) / Risk Weighted Assets × 100

ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী ন্যূনতম মূলধন:

উপাদানব্যাসেল-২ব্যাসেল-৩
Common Equity Tier-1 (CET1)২%৪.৫%
Tier-1 Capital৪%৬.০%
মোট মূলধন (Tier-1 + Tier-2)৮%৮.০%
Capital Conservation Buffer০%২.৫%
মোট প্রয়োজন৮%১০.৫%

বাংলাদেশে প্রয়োগ (২০২৬):

ন্যূনতম CAR:
- সাধারণ ব্যাংক: ১০%
- ইসলামী ব্যাংক: ১০%
- বিদেশি ব্যাংক শাখা: ১০%

লক্ষ্য (২০২৭ থেকে):
- মোট CAR: ১২.৫%
- Tier-1: ৭.৫%
- CET1: ৫.৫%

Tier-1 ও Tier-2 মূলধনের সংজ্ঞা:

Tier-1 Capital (Core Capital): ১. পরিশোধিত শেয়ার মূলধন (Paid-up Capital) ২. স্ট্যাটুটরি রিজার্ভ (Statutory Reserve) ৩. রিটেইনড আর্নিংস (Retained Earnings) ৪. সাধারণ রিজার্ভ (General Reserve) বাদ: গুডউইল, ইনট্যানজিবল অ্যাসেট

Tier-2 Capital (Supplementary Capital): ১. সাধারণ প্রভিশন (General Provision): RWA-এর সর্বোচ্চ ১.২৫% ২. রিভ্যালুয়েশন রিজার্ভ: সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন লাভের ৫০% ৩. সাবর্ডিনেটেড ডেট (Subordinated Debt): দীর্ঘমেয়াদি ঋণ (ন্যূনতম ৫ বছর) ৪. হাইব্রিড ক্যাপিটাল ইন্সট্রুমেন্ট

উদাহরণ গণনা:

একটি ব্যাংকের তথ্য:
পরিশোধিত মূলধন: ২০০ কোটি টাকা
স্ট্যাটুটরি রিজার্ভ: ১৫০ কোটি
রিটেইনড আর্নিংস: ১০০ কোটি
গুডউইল: ৫০ কোটি
সাধারণ প্রভিশন: ৮০ কোটি
সাবর্ডিনেটেড ডেট: ১০০ কোটি
Risk Weighted Assets (RWA): ৪,০০০ কোটি

Tier-1 = ২০০ + ১৫০ + ১০০ - ৫০ = ৪০০ কোটি
Tier-2 = ৮০ + ১০০ = ১৮০ কোটি (তবে RWA-এর ১.২৫% = ৫০ কোটি পর্যন্ত প্রভিশন গণনা হবে, তাই Tier-2 = ৫০ + ১০০ = ১৫০ কোটি)

মোট মূলধন = ৪০০ + ১৫০ = ৫৫০ কোটি

CAR = ৫৫০ / ৪,০০০ × ১০০ = ১৩.৭৫%

ফলাফল: CAR ১৩.৭৫% > ১০% (ন্যূনতম) → ব্যাংক মানদণ্ড পূরণ করেছে

খ. ঝুঁকি ওজনিত সম্পদ (Risk Weighted Assets — RWA)

RWA গণনা পদ্ধতি: বিভিন্ন সম্পদের ঝুঁকি অনুযায়ী ওজন (Risk Weight) নির্ধারণ করে মোট সম্পদ গণনা।

ঝুঁকি ওজন সারণি:

সম্পদের ধরনঝুঁকি ওজন (%)উদাহরণ
নগদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা০%CRR, ভল্টে নগদ
সরকারি ট্রেজারি বিল/বন্ড০%সরকারি সিকিউরিটিজ
AAA রেটেড ব্যাংক২০%অন্য ব্যাংকে জমা
আবাসিক বন্ধক (Residential Mortgage)৫০%-৭৫%বাড়ি ঋণ
বাণিজ্যিক ঋণ১০০%কর্পোরেট ঋণ, SME
ক্রেডিট কার্ড১২৫%অসুরক্ষিত ঋণ
শেয়ার বিনিয়োগ১৫০%-৩০০%স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ

RWA গণনা উদাহরণ:

একটি ব্যাংকের সম্পদ:
নগদ: ১০০ কোটি → RWA = ১০০ × ০% = ০
সরকারি বন্ড: ৫০০ কোটি → RWA = ৫০০ × ০% = ০
বাড়ি ঋণ: ১,০০০ কোটি → RWA = ১,০০০ × ৫০% = ৫০০ কোটি
বাণিজ্যিক ঋণ: ২,০০০ কোটি → RWA = ২,০০০ × ১০০% = ২,০০০ কোটি
ক্রেডিট কার্ড: ৫০০ কোটি → RWA = ৫০০ × ১২৫% = ৬২৫ কোটি

মোট RWA = ০ + ০ + ৫০০ + ২,০০০ + ৬২৫ = ৩,১২৫ কোটি টাকা

গ. তারল্য মান (Liquidity Ratios)

ব্যাসেল-৩-এ দুটি নতুন তারল্য মান:

১. Liquidity Coverage Ratio (LCR):

LCR = High-Quality Liquid Assets (HQLA) / Net Cash Outflow (30 days stress) × 100

ন্যূনতম: ১০০%

HQLA = উচ্চ মানের তারল্য সম্পদ:

  • নগদ
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ
  • সরকারি সিকিউরিটিজ (০% রিস্ক ওয়েট)

Net Cash Outflow = ৩০ দিনের স্ট্রেস পরিস্থিতিতে টাকা বের হওয়া:

  • আমানত উত্তোলন (৫-১০%)
  • আন্তঃব্যাংক ঋণ পরিশোধ
  • এলসি পেমেন্ট

উদাহরণ:

HQLA: ৫০০ কোটি টাকা
৩০ দিনের স্ট্রেসে নগদ প্রয়োজন: ৪০০ কোটি

LCR = ৫০০ / ৪০০ × ১০০ = ১২৫%

ফলাফল: LCR ১২৫% > ১০০% (মানদণ্ড পূরণ)

২. Net Stable Funding Ratio (NSFR):

NSFR = Available Stable Funding / Required Stable Funding × 100

ন্যূনতম: ১০০%

উদ্দেশ্য: দীর্ঘমেয়াদি (১ বছর) তারল্য নিশ্চিত করা

Available Stable Funding:

  • দীর্ঘমেয়াদি আমানত (১ বছর+)
  • শেয়ার মূলধন
  • রিজার্ভ

Required Stable Funding:

  • দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদান
  • স্থায়ী সম্পদ (বিল্ডিং, যন্ত্রপাতি)

ঘ. লিভারেজ রেশিও (Leverage Ratio)

সংজ্ঞা:

Leverage Ratio = Tier-1 Capital / Total Exposure × 100

ন্যূনতম: ৩%

Total Exposure = সব ধরনের সম্পদ + অফ-ব্যালান্স শিট আইটেম

উদ্দেশ্য:

  • ঝুঁকি ওজনের ম্যানিপুলেশন রোধ করা
  • সরল মূলধন মান প্রদান

উদাহরণ:

Tier-1 Capital: ৫০০ কোটি টাকা
মোট এক্সপোজার: ১৫,০০০ কোটি

Leverage Ratio = ৫০০ / ১৫,০০০ × ১০০ = ৩.৩৩%

ফলাফল: ৩.৩৩% > ৩% (মানদণ্ড পূরণ)

১২.৩ ব্যাসেল-৩-এর প্রভাব

ব্যাংকের উপর: ✓ ইতিবাচক:

  • ব্যাংকের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি
  • আর্থিক সংকটের ঝুঁকি হ্রাস
  • আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন

নেতিবাচক:

  • অতিরিক্ত মূলধন সংগ্রহ প্রয়োজন (বিশেষত দুর্বল ব্যাংকের জন্য)
  • ঋণ প্রদান ক্ষমতা হ্রাস (কারণ বেশি মূলধন রাখতে হয়)
  • প্রফিটেবিলিটি কমার সম্ভাবনা (ROE হ্রাস)

বাংলাদেশে চ্যালেঞ্জ: ১. খেলাপি ঋণের উচ্চ হার: NPL ১০.৮৩%, যা মূলধন ক্ষয় করে ২. দুর্বল গভর্নেন্স: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি ৩. মূলধন সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা: শেয়ার বাজার দুর্বল, নতুন মূলধন সংগ্রহ কঠিন ৪. ডেটা ও প্রযুক্তি ঘাটতি: উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির অভাব


১৩. মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS)

১৩.১ MFS-এর সংজ্ঞা ও উৎপত্তি

সংজ্ঞা: মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) হলো মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক সেবা প্রদান, যেখানে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়াই টাকা জমা, উত্তোলন, স্থানান্তর, বিল পরিশোধ ইত্যাদি করা যায়।

বাংলাদেশে MFS-এর সূচনা:

  • ২০১১ সাল: বাংলাদেশ ব্যাংক MFS Guidelines জারি করে
  • প্রথম লঞ্চ: ডাচ-বাংলা ব্যাংক “রকেট” (মার্চ ২০১১)
  • সবচেয়ে জনপ্রিয়: বিকাশ (জুলাই ২০১১, ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের সহায়ক প্রতিষ্ঠান)

রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক:

  • বাংলাদেশ ব্যাংক গাইডলাইন ২০১১ (Guidelines on Mobile Financial Services for Banks)
  • সর্বশেষ সংশোধন: ২০১৮, ২০২১

১৩.২ MFS প্রদানকারী

বাংলাদেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত MFS প্রদানকারী (২০২৬):

প্রতিষ্ঠানমূল ব্যাংকচালুবাজার শেয়ার (%)
বিকাশব্র্যাক ব্যাংক২০১১৬৮.৫%
নগদবাংলাদেশ পোস্ট অফিস (ব্যাংক নয়, বিশেষ লাইসেন্স)২০১৭১৮.২%
রকেটডাচ-বাংলা ব্যাংক২০১১৭.৮%
উপায়ট্রাস্ট ব্যাংক২০১৬৩.৫%
টি-ক্যাশট্রাস্ট ব্যাংক২০১৬০.৯%
এমক্যাশইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ২০১৩০.৫%
সিটিসেলসিটি ব্যাংক২০১২০.৩%
সিওর ক্যাশব্র্যাক ব্যাংক২০১৫০.২%
মাইক্যাশমার্কেন্টাইল ব্যাংক২০১৮০.১%

১৩.৩ MFS-এর সেবাসমূহ

১. ক্যাশ-ইন (Cash-In): টাকা জমা করা — এজেন্ট পয়েন্টে গিয়ে নগদ টাকা দিয়ে মোবাইল ওয়ালেটে ব্যালান্স যোগ করা।

২. ক্যাশ-আউট (Cash-Out): টাকা উত্তোলন — মোবাইল ওয়ালেট থেকে নগদ টাকা নেওয়া।

৩. পার্সন টু পার্সন (P2P): এক ব্যক্তির ওয়ালেট থেকে অন্য ব্যক্তির ওয়ালেটে টাকা পাঠানো।

৪. মার্চেন্ট পেমেন্ট: দোকানে পণ্য কেনার সময় MFS দিয়ে পেমেন্ট।

৫. বিল পেমেন্ট: বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ইন্টারনেট বিল পরিশোধ।

৬. সেলারি ডিসবার্সমেন্ট: কোম্পানি কর্মচারীদের বেতন MFS-এ দেয়।

৭. সরকারি পেমেন্ট (G2P): সরকারি ভাতা (বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, শিক্ষা বৃত্তি) MFS-এ প্রদান।

৮. রেমিট্যান্স: বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা সরাসরি MFS ওয়ালেটে গ্রহণ।

৯. মাইক্রো লোন: ছোট ঋণ MFS-এর মাধ্যমে প্রদান (বিকাশ সেভিংস, নগদ লোন)।

১০. ইন্টারন্যাশনাল রেমিট্যান্স: বিদেশ থেকে সরাসরি MFS ওয়ালেটে টাকা পাঠানো (Western Union, MoneyGram-এর সাথে সংযুক্তি)।

১৩.৪ MFS লেনদেন সীমা (২০২৬)

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট:

লেনদেনের ধরনদৈনিক সীমামাসিক সীমা
ক্যাশ-ইন৫০,০০০ টাকা২,০০,০০০ টাকা
ক্যাশ-আউট২৫,০০০ টাকা১,০০,০০০ টাকা
P2P স্থানান্তর৫০,০০০ টাকা২,০০,০০০ টাকা
মার্চেন্ট পেমেন্ট৫০,০০০ টাকাসীমাহীন
সর্বোচ্চ ব্যালান্স২০,০০০ টাকা

এজেন্ট অ্যাকাউন্ট:

  • দৈনিক ক্যাশ-ইন/আউট: ২ লাখ টাকা
  • সর্বোচ্চ ব্যালান্স: ৫০,০০০ টাকা

মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট:

  • সীমাহীন (কিন্তু প্রতিদিন ব্যাংকে স্থানান্তর বাধ্যতামূলক)

১৩.৫ MFS চার্জ কাঠামো (বিকাশ উদাহরণ)

সেবাচার্জ
ক্যাশ-ইনবিনামূল্য
ক্যাশ-আউট১৪.৯০ টাকা (প্রতি ১,০০০ টাকায়)
P2P (Send Money)বিনামূল্য (৫,০০০ টাকা পর্যন্ত), তারপর ৫ টাকা
মার্চেন্ট পেমেন্টবিনামূল্য (গ্রাহক), ১.৮৫% (মার্চেন্ট)
বিল পেমেন্টবিনামূল্য

১৩.৬ এজেন্ট ব্যাংকিং বনাম MFS

বিষয়MFSএজেন্ট ব্যাংকিং
সংজ্ঞামোবাইল ওয়ালেট সেবাব্যাংক অ্যাকাউন্ট সেবা
অ্যাকাউন্টওয়ালেট (ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয়)প্রকৃত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
সুদপাওয়া যায় নাপাওয়া যায়
KYCসহজ (NID ফটোকপি)কঠোর (NID ভেরিফিকেশন)
লেনদেন সীমাসীমিতবেশি
উদাহরণবিকাশ, নগদ, রকেটব্যাংক এশিয়া এজেন্ট, DBBL এজেন্ট

১৩.৭ MFS-এর পরিসংখ্যান (মার্চ ২০২৬)

মোট রেজিস্টার্ড অ্যাকাউন্ট: ১৮.৫ কোটি
সক্রিয় অ্যাকাউন্ট (মাসিক): ৯.২ কোটি
এজেন্ট পয়েন্ট: ২০.৮ লাখ

দৈনিক লেনদেন: 
- সংখ্যা: ৫.৫ কোটি লেনদেন
- পরিমাণ: ১২,৮০০ কোটি টাকা

মাসিক লেনদেন:
- সংখ্যা: ১৫০ কোটি
- পরিমাণ: ৩,৮৪,০০০ কোটি টাকা

লেনদেনের ধরন (শতাংশ):
- ক্যাশ-ইন: ৩৫%
- ক্যাশ-আউট: ২৮%
- P2P: ২৫%
- মার্চেন্ট পেমেন্ট: ৮%
- বিল পেমেন্ট: ৪%

১৩.৮ MFS-এর চ্যালেঞ্জ

১. সাইবার নিরাপত্তা:

  • SIM সোয়াপিং স্ক্যাম (ফোন নম্বর চুরি)
  • ফিশিং (ভুয়া কাস্টমার কেয়ার কল)
  • ২০২৩-২৫-এ প্রায় ৫০০ কোটি টাকার MFS জালিয়াতি রিপোর্ট

২. এজেন্ট তারল্য সংকট:

  • গ্রামে এজেন্টদের কাছে পর্যাপ্ত নগদ থাকে না
  • ক্যাশ-আউট করতে সমস্যা

৩. ইন্টারঅপারেবিলিটির অভাব:

  • বিকাশ থেকে নগদ বা রকেটে সরাসরি টাকা পাঠানো যায় না
  • প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম আলাদা

৪. আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সীমাবদ্ধতা:

  • অনেক MFS ব্যবহারকারী শুধু ক্যাশ-ইন/আউট করে, অন্য সেবা ব্যবহার করে না
  • প্রকৃত ব্যাংকিং সেবা (ঋণ, সঞ্চয়) সীমিত

১৪. হস্তান্তরযোগ্য দলিল (Negotiable Instruments)

১৪.১ আইনি ভিত্তি

আইন: Negotiable Instruments Act, 1881 (Act No. XXVI of 1881)

প্রয়োগ: ব্রিটিশ ভারতে পাস হয়েছিল, বাংলাদেশে এখনও কার্যকর (কিছু সংশোধনসহ)

সংজ্ঞা: হস্তান্তরযোগ্য দলিল হলো এমন লিখিত দলিল যা একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে হস্তান্তরিত হতে পারে এবং যার ধারক আইনগত অধিকার লাভ করে।

প্রধান ধরন: ১. চেক (Cheque) ২. প্রমিসরি নোট (Promissory Note) ৩. বিল অব এক্সচেঞ্জ (Bill of Exchange)

১৪.২ চেক (Cheque)

সংজ্ঞা (ধারা ৬ অনুযায়ী): চেক হলো একটি লিখিত নির্দেশ যা একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের কাছে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ চাহিবামাত্র পরিশোধ করার জন্য।

চেকের অপরিহার্য উপাদান: ১. লিখিত দলিল: মৌখিক নির্দেশ গ্রহণযোগ্য নয় ২. নির্দিষ্ট ব্যাংকের নাম: কোন ব্যাংক টাকা দেবে তা স্পষ্ট ৩. নির্দিষ্ট অর্থ: পরিমাণ সংখ্যা ও কথায় লিখতে হবে ৪. চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য: কোনো শর্ত থাকতে পারবে না ৫. স্বাক্ষর: চেক ইস্যুকারীর স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক

চেকের প্রকারভেদ:

১. বেয়ারার চেক (Bearer Cheque): যে কেউ ব্যাংকে নিয়ে গেলে টাকা পাবে, নাম যাচাই করা হয় না।

উদাহরণ:
Pay to: Bearer or ..............................
       অথবা বাহক

ঝুঁকি: চেক হারিয়ে গেলে যে কেউ তুলে নিতে পারে

২. অর্ডার চেক (Order Cheque): যার নামে চেক লেখা তিনি বা তার নির্দেশিত ব্যক্তি টাকা পাবে।

উদাহরণ:
Pay to: Mr. Karim or Order

নিরাপদ: ধারককে পরিচয়পত্র দেখাতে হয়

৩. ক্রসড চেক (Crossed Cheque): চেকের উপর দুটি সমান্তরাল রেখা (||) দেওয়া, শুধুমাত্র ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে, নগদ নেওয়া যাবে না।

প্রকারভেদ:
ক. জেনারেল ক্রসিং: ||  শুধু দুটি রেখা
খ. স্পেশাল ক্রসিং: || DBBL || নির্দিষ্ট ব্যাংকের নাম
গ. অ্যাকাউন্ট পেয়ি: || A/C Payee ||

সবচেয়ে নিরাপদ: অ্যাকাউন্ট পেয়ি ক্রসড চেক

৪. স্টেল চেক (Stale Cheque): ইস্যুর তারিখ থেকে ৬ মাস পার হয়ে গেছে, আর বৈধ নয়।

৫. পোস্ট-ডেটেড চেক (Post-Dated Cheque — PDC): ভবিষ্যত তারিখ দিয়ে দেওয়া চেক, সেই তারিখের আগে ক্যাশ করা যাবে না।

উদাহরণ:
আজকের তারিখ: ১০ মে ২০২৬
চেকে লেখা তারিখ: ১০ জুন ২০২৬ (ভবিষ্যত)

১০ জুন-এর আগে ব্যাংক এই চেক গ্রহণ করবে না।

৬. অ্যান্টি-ডেটেড চেক (Anti-Dated Cheque): অতীত তারিখ দিয়ে দেওয়া চেক (কিন্তু ৬ মাসের মধ্যে)।

চেক বাউন্সের কারণ: ১. অপর্যাপ্ত তহবিল: অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা নেই ২. স্বাক্ষর অমিল: চেকের স্বাক্ষর ব্যাংক রেকর্ডের সাথে মেলে না ৩. স্টেল চেক: ৬ মাস পার হয়ে গেছে ৪. অতিরিক্ত লেখা (Overwriting): চেকে কাটাকাটি বা সংশোধন ৫. শব্দ ও সংখ্যার অমিল: কথায় লেখা ও সংখ্যায় লেখা পরিমাণ আলাদা ৬. পোস্ট-ডেটেড চেক: নির্দিষ্ট তারিখের আগে জমা দেওয়া ৭. অ্যাকাউন্ট বন্ধ: যে অ্যাকাউন্ট থেকে চেক দেওয়া, সেটি বন্ধ হয়ে গেছে

চেক অসম্মান আইন (Cheque Dishonour):

  • ধারা ১৩৮ (Negotiable Instruments Act): চেক বাউন্স হলে ফৌজদারি অপরাধ
  • শাস্তি: ২ বছর কারাদণ্ড বা চেকের দ্বিগুণ পরিমাণ জরিমানা
  • শর্ত: চেক বাউন্সের ১৫ দিনের মধ্যে ইস্যুকারীকে নোটিশ দিতে হবে

১৪.৩ পে-অর্ডার (Pay Order)

সংজ্ঞা: পে-অর্ডার হলো ব্যাংক নিজে ইস্যু করে নিজেই পরিশোধ করে — অর্থাৎ একই ব্যাংকের এক শাখা থেকে অন্য শাখায় টাকা স্থানান্তর।

বৈশিষ্ট্য:

  • নিশ্চিত পেমেন্ট: ব্যাংক আগেই টাকা নিয়ে নেয়, বাউন্স হয় না
  • একই ব্যাংকে সীমাবদ্ধ: শুধু একই ব্যাংকের শাখায় ক্যাশ করা যায়
  • ৬ মাস বৈধতা: ইস্যুর ৬ মাস পর মেয়াদ শেষ

ব্যবহার:

  • সরকারি টেন্ডার জমা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি
  • বড় অঙ্কের লেনদেন যেখানে নিশ্চয়তা প্রয়োজন

চেক বনাম পে-অর্ডার:

বিষয়চেকপে-অর্ডার
ইস্যুকারীঅ্যাকাউন্ট হোল্ডারব্যাংক
বাউন্সহতে পারেহয় না
ব্যবহার এলাকাযেকোনো ব্যাংকেএকই ব্যাংকে
মূল্যবিনামূল্য১০০-৫০০ টাকা চার্জ

১৪.৪ ব্যাংক ড্রাফট (Bank Draft — DD)

সংজ্ঞা: ড্রাফট হলো ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত একটি আদেশপত্র যেখানে এক শহরের ব্যাংক অন্য শহরের ব্যাংক শাখাকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টাকা দিতে বলে।

বৈশিষ্ট্য:

  • নিশ্চিত পেমেন্ট: ব্যাংক আগেই টাকা নিয়ে নেয়
  • দূরবর্তী স্থানে ব্যবহার: এক শহর থেকে অন্য শহরে
  • নিরাপদ: বাউন্স হয় না
  • বৈধতা: ৩ মাস

ব্যবহার:

  • বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি (দূরের শহরে)
  • বড় ক্রয়ের পেমেন্ট
  • জমি রেজিস্ট্রেশন

পে-অর্ডার বনাম ড্রাফট:

বিষয়পে-অর্ডারব্যাংক ড্রাফট
ব্যবহার এলাকাএকই শহরেবিভিন্ন শহরে
ক্লিয়ারিংপ্রয়োজন নেইপ্রয়োজন
সময়তাৎক্ষণিক১-৩ দিন
চার্জ১০০-৩০০ টাকা২০০-৬০০ টাকা

১৫. ক্রলিং পেগ পদ্ধতি (Crawling Peg System)

১৫.১ ক্রলিং পেগের সংজ্ঞা

Crawling Peg System: এমন একটি বিনিময় হার ব্যবস্থা যেখানে মুদ্রার মূল্য ধীরে ধীরে (ক্রমান্বয়ে) সমন্বয় করা হয়, স্থির বিনিময় হার (Fixed) ও ভাসমান বিনিময় হার (Floating) এর মধ্যবর্তী একটি পদ্ধতি।

মূলনীতি:

  • কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি রেফারেন্স রেট নির্ধারণ করে
  • প্রতিদিন সেই রেট সামান্য (০.১-০.৫%) পরিবর্তন করার সুযোগ থাকে
  • বাজার চাহিদা ও সরবরাহ অনুযায়ী ধীরে সমন্বয়

১৫.২ বাংলাদেশে ক্রলিং পেগ প্রয়োগ

পটভূমি: ২০২২-২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডলার সংকট তীব্র হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্থির হারে (৮৬ টাকা) ডলার ধরে রাখতে চেষ্টা করলে:

  • কালোবাজারে ডলার ১১০-১২০ টাকায় বিক্রয়
  • রেমিট্যান্স হুন্ডির মাধ্যমে আসতে শুরু করে
  • রপ্তানিকারকরা আন্ডার-ইনভয়েসিং করে

IMF-এর পরামর্শ (২০২৩):

  • স্থির হার ছেড়ে দিয়ে বাজার-ভিত্তিক বিনিময় হারে যেতে হবে
  • ক্রলিং পেগ একটি মধ্যবর্তী সমাধান

বাস্তবায়ন:

  • মে ২০২৩: বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রলিং পেগ ঘোষণা করে
  • CRER (Crawling-Band Exchange Rate) নামে পরিচিত
  • রেফারেন্স রেট: প্রতিদিন বাংলাদেশ ব্যাংক একটি রেট ঘোষণা করে

১৫.৩ ক্রলিং পেগের কার্যপদ্ধতি

রেট নির্ধারণ প্রক্রিয়া:

ধাপ ১: বাংলাদেশ ব্যাংক আগের দিনের ইন্টারব্যাংক লেনদেন পর্যালোচনা করে
      ↓
ধাপ ২: চাহিদা-সরবরাহ অবস্থা বিশ্লেষণ
      ↓
ধাপ ৩: নতুন রেফারেন্স রেট ঘোষণা (সর্বোচ্চ ০.৫% পরিবর্তন)
      ↓
ধাপ ৪: ব্যাংকগুলো রেফারেন্স রেটের ±১% সীমার মধ্যে লেনদেন করতে পারে

উদাহরণ (কাল্পনিক):

১০ মে ২০২৬:
রেফারেন্স রেট: ১১৮.৫০ টাকা/ডলার
ব্যাংক লেনদেন সীমা: ১১৭.৩২ - ১১৯.৬৮ টাকা

১১ মে ২০২৬ (যদি ডলারের চাহিদা বেশি থাকে):
রেফারেন্স রেট: ১১৯.০০ টাকা/ডলার (+০.৪২%)
ব্যাংক লেনদেন সীমা: ১১৭.৮১ - ১২০.১৯ টাকা

১২ মে ২০২৬ (যদি রেমিট্যান্স বেশি আসে):
রেফারেন্স রেট: ১১৮.৭০ টাকা/ডলার (-০.২৫%)
ব্যাংক লেনদেন সীমা: ১১৭.৫১ - ১১৯.৮৯ টাকা

১৫.৪ ক্রলিং পেগের সুবিধা

১. ধীরে ধীরে সমন্বয়: হঠাৎ বড় ধাক্কা এড়ানো যায় — ৮৬ টাকা থেকে সরাসরি ১২০ টাকায় না গিয়ে ক্রমান্বয়ে যাওয়া।

২. আমদানিকারকদের পরিকল্পনার সুযোগ: ধীরে ধীরে রেট বাড়লে ব্যবসায়ীরা খরচ সমন্বয় করতে পারে।

৩. রেমিট্যান্স বৃদ্ধি: অফিশিয়াল চ্যানেলে ভালো রেট পেলে হুন্ডির মাধ্যমে না পাঠিয়ে ব্যাংকে পাঠায়।

৪. রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা: উচ্চ ডলার রেট রপ্তানিকারকদের বেশি টাকা দেয়, রপ্তানি বৃদ্ধিতে উৎসাহ।

৫. কালোবাজার নিয়ন্ত্রণ: অফিশিয়াল ও কালোবাজারের পার্থক্য কমে।

১৫.৫ ক্রলিং পেগের অসুবিধা

১. আমদানি ব্যয়বহুল: ডলার দাম বাড়লে আমদানি খরচ বাড়ে → মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি।

২. রিজার্ভ সুরক্ষায় সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ কমালে রিজার্ভ রক্ষা কঠিন।

৩. অনিশ্চয়তা: প্রতিদিন রেট পরিবর্তন ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় জটিলতা তৈরি করে।

৪. IMF শর্তের চাপ: IMF সম্পূর্ণ ভাসমান বিনিময় হার চায়, ক্রলিং পেগ মধ্যবর্তী ব্যবস্থা মাত্র।

১৫.৬ বিনিময় হার ব্যবস্থার তুলনা

ব্যবস্থাসংজ্ঞাবাংলাদেশে প্রয়োগসুবিধাঅসুবিধা
Fixed Pegস্থির হার (যেমন ১ ডলার = ৮৬ টাকা)২০২২ পর্যন্তস্থিতিশীলতা, পরিকল্পনা সহজকালোবাজার, রিজার্ভ ক্ষয়
Crawling Pegধীরে ধীরে সমন্বয়২০২৩-বর্তমানমধ্যপন্থা, নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনঅনিশ্চয়তা, আংশিক সমাধান
Floatingসম্পূর্ণ বাজার নির্ধারিতভবিষ্যত (IMF শর্ত)বাজার দক্ষতা, কালোবাজার নেইতীব্র ওঠানামা, মুদ্রাস্ফীতি ঝুঁকি

১৫.৭ বর্তমান পরিস্থিতি (মে ২০২৬)

বর্তমান রেফারেন্স রেট: ১১৮.৫ টাকা/ডলার
ব্যাংক লেনদেন সীমা: ১১৭.৩ - ১১৯.৭ টাকা
কার্বসাইড (খোলা বাজার): ১২০-১২২ টাকা

ট্রেন্ড (গত ১ বছর):
মে ২০২৫: ১১০ টাকা
আগস্ট ২০২৫: ১১৩ টাকা
নভেম্বর ২০২৫: ১১৬ টাকা
ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ১১৭.৫ টাকা
মে ২০২৬: ১১৮.৫ টাকা

গড় মাসিক বৃদ্ধি: ০.৭% (ধীরে ধীরে সমন্বয়)

প্রভাব পর্যালোচনা: ✓ রেমিট্যান্স বৃদ্ধি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪.৮ বিলিয়ন USD (২০২২-২৩-এ ২১.৯ বিলিয়ন) ✓ রপ্তানি পুনরুদ্ধার: ৫০.২ বিলিয়ন USD (২০২৩-২৪-এ ৪৭.৪ বিলিয়ন) ✗ মুদ্রাস্ফীতি: ৮.৫% (লক্ষ্য ছিল ৬.৫%) ✗ আমদানি ব্যয়: জ্বালানি ও খাদ্য আমদানি ২৫% বেশি ব্যয়বহুল

Last Updated on 6 hours ago by Asiful Haque

Md Asiful Haque

লেখক: মো. আসিফুল হক

সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
৪৩তম বিসিএস (প্রশাসন ক্যাডার)
কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়

শিক্ষা: MBA (IBA), BSc in CSE (BUET)

বিসিএস পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর সরকারি প্রশাসনে যোগদান করেছি ২০২৫ সালে। প্রতিদিন মাঠ পর্যায়ে সংবিধান, আইন, ও প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রয়োগ করার অভিজ্ঞতা থেকে লিখি এই ব্লগ।

Leave a comment