টাইম স্কেল বনাম বিএড স্কেল: প্রধান শিক্ষক হিসেবে কোন শিক্ষক কোনটা পাবেন

Contents hide

বাংলাদেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয় তিনটি শব্দ ঘিরে: টাইম স্কেল, বিএড স্কেল এবং উচ্চতর গ্রেড। বিশেষ করে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে যাওয়ার সময় প্রশ্নগুলো আরও জটিল হয়ে ওঠে—আগের স্কেল কি বহাল থাকবে, নতুন করে ১০ বছর গণনা হবে কি না, প্রধান শিক্ষক পদে আবার বিএড স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে কি না।

এই নিবন্ধে বর্তমানে কার্যকর নীতিমালা ও সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোর ভিত্তিতে পুরো হিসাবটি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হলো।

১. প্রথমে মৌলিক পার্থক্যটা বুঝুন

বিএড স্কেল আর উচ্চতর গ্রেড—দুটোর ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা।

বিষয়বিএড স্কেলউচ্চতর গ্রেড (বর্তমান টাইম স্কেল)
ভিত্তিপেশাগত/শিক্ষাগত যোগ্যতাচাকরির নিরবচ্ছিন্ন সন্তোষজনক মেয়াদ
অর্জিত হয়বিএড বা সমমান ডিগ্রি অর্জনেনির্দিষ্ট গ্রেডে ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে
উদাহরণ১১তম গ্রেড → ১০ম গ্রেড১০ম গ্রেড → ৯ম গ্রেড → ৮ম গ্রেড
উচ্চতর গ্রেড হিসেবে গণ্যনাহ্যাঁ
সর্বোচ্চ সংখ্যাএকবার (ডিগ্রি অনুযায়ী)পুরো চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুটি

মনে রাখার সহজ নিয়ম:

বিএড ডিগ্রি ≠ বিএড স্কেল, এবং বিএড স্কেল ≠ উচ্চতর গ্রেড।

২. পুরোনো টাইম স্কেল আসলে কোথায় গেল

আগে নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত ৮, ১২ বা ১৫ বছর) একই পদে সন্তোষজনক চাকরি করলে পদোন্নতি ছাড়াই পরবর্তী বেতন স্কেল পাওয়া যেত—এটাই ছিল পুরোনো টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড ব্যবস্থা। জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর মাধ্যমে এই পুরোনো ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়, এবং এর জায়গায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর বেতন গ্রেড নামে নতুন কাঠামো চালু হয়। তাই আজকের কোনো কেসে কেউ “১০ বছর হয়েছে, তাই টাইম স্কেল পাব” বললে বিষয়টি ভাষাগতভাবে ভুল—বাস্তবে তিনি বর্তমান উচ্চতর গ্রেডের কথাই বলছেন।

৩. বিএড স্কেল: কে পাবেন, কীভাবে পাবেন

স্কুলে বিএড ছাড়া সহকারী শিক্ষক ১১তম গ্রেডে (মূল বেতন ১২,৫০০ টাকা) যোগদান করেন। নিয়োগের সময়ই স্বীকৃত বিএড ডিগ্রি থাকলে সরাসরি ১০ম গ্রেডে (মূল বেতন ১৬,০০০ টাকা) যোগদান করা যায়। বিএড ছাড়া যোগদান করলে নির্ধারিত সময়ের (সাধারণত ৫ বছরের) মধ্যে স্বীকৃত টিচার্স ট্রেনিং কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড বা সমমান প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলে ১০ম গ্রেডের সুবিধা পাওয়া যায়।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, এই ১১তম থেকে ১০ম গ্রেডে ওঠাকে সরকার আলাদাভাবে ‘উচ্চতর স্কেল’ হিসেবে গণ্য করে না। এটি শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের ফল, চাকরির মেয়াদভিত্তিক সুবিধা নয়।

দুটি বিষয় সবসময় আলাদাভাবে যাচাই করুন—

  • বিএড সনদ থাকা
  • এমপিও শিটে বিএড স্কেল অনুমোদিত হয়ে ১০ম গ্রেড কার্যকর হওয়া

সনদ অর্জনের তারিখ আর স্কেল কার্যকরের তারিখ এক নাও হতে পারে। শেষোক্ত তারিখটিই সরকারি হিসাবে গ্রহণযোগ্য।

৪. উচ্চতর গ্রেড ও সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম

বেসরকারি স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, সহকারী শিক্ষকগণ জাতীয় বেতন স্কেলের ১০ম গ্রেড প্রাপ্তির তারিখ থেকে ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্ণ হলে ৯ম গ্রেডে উচ্চতর বেতন গ্রেড পাবেন এবং সেই সঙ্গে তাঁর পদ “সিনিয়র শিক্ষক” হিসেবে উন্নীত হবে। যাঁদের ক্ষেত্রে ১০ম গ্রেড পাওয়ার জন্য শিক্ষায় ডিগ্রি (বিএড) বাধ্যতামূলক, তাঁরা বিএড ছাড়া সিনিয়র শিক্ষক পদে উন্নীত হতে পারবেন না। এরপর ৯ম গ্রেড প্রাপ্তির আরও ৬ বছর পর (অর্থাৎ মোট ১৬ বছরে) দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হন।সহকারী শিক্ষকগণ জাতীয় বেতন স্কেলের ১০ম গ্রেড প্রাপ্তির তারিখ হতে ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্ণ হলে জাতীয় বেতনস্কেলে ৯ম গ্রেডে উচ্চতর বেতন গ্রেড প্রাপ্য হবেন এবং ঐ শিক্ষকের পদ সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে উন্নীত হবে, আর যাঁদের ক্ষেত্রে ১০ম গ্রেড প্রাপ্তির জন্য শিক্ষায় ডিগ্রি অর্জন প্রযোজ্য তাঁরা এই ডিগ্রি ছাড়া সিনিয়র শিক্ষক পদে উন্নীত হতে পারবেন না, এবং ৯ম গ্রেড প্রাপ্তির পরবর্তী ৬ বছর পর একইভাবে পরবর্তী উচ্চতর বেতন গ্রেড প্রাপ্য হন। Teachers Portal

এখানে যে ভুলটা সবচেয়ে বেশি হয় তা হলো ১০ বছরের গণনা কোন তারিখ থেকে শুরু হবে তা নিয়ে। সঠিক নিয়ম হলো—

গণনা শুরু হয় বিএড স্কেল কার্যকর হয়ে ১০ম গ্রেডে ওঠার তারিখ থেকে, প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে নয় (যাঁদের ক্ষেত্রে ১০ম গ্রেডের জন্য বিএড আবশ্যিক)।

এই একটি তথ্যই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দূর করে। ২০২০ সালে অর্থ বিভাগও এই ব্যাখ্যা স্পষ্টীকরণ আকারে জারি করেছিল, যেখানে বিএড স্কেল প্রাপ্তির তারিখ থেকেই উচ্চতর গ্রেডের মেয়াদ গণনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গ্রেড প্রাপ্তির তারিখ থেকে গণনা করে এমপিও নীতিমালা অনুসারে ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্তির নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। Teachers Portal

সীমাবদ্ধতাগুলো মনে রাখুন—

  • সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুটি উচ্চতর গ্রেড/টাইম স্কেল পাওয়া যায়, যে নামেই অভিহিত হোক না কেন।
  • বিভাগীয় মামলা চলমান থাকলে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হবেন না।
  • গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকরা উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধা পান, কিন্তু তাঁরা “সিনিয়র শিক্ষক” পদে পদোন্নতি পান না—কারণ তাঁদের পদ কাঠামোগতভাবে ভিন্ন।সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান) তার উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধাদি প্রাপ্য হবেন তবে তিনি সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি প্রাপ্য হবেন না। The Daily Campus

সাম্প্রতিক আপডেট: এমপিও নীতিমালা-২০২৫

২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ “বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) এর জনবল কাঠামো ও এম.পি.ও নীতিমালা, ২০২৫” প্রকাশ করেছে, যা আগের ২০২১ নীতিমালার জায়গা নিয়েছে।এই নীতিমালা ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। এই নীতিমালায়— Shed

  • সহকারী শিক্ষকদের ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরির পর সিনিয়র শিক্ষক পদে পদোন্নতির বিধান পুনর্নিশ্চিত করা হয়েছে।এতে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষকরা নিয়োগকালীন কাম্য শিক্ষা যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে ১০ম গ্রেডে সন্তোষজনক ১০ বছর চাকরি পূর্তিতে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে বিবেচিত হবেন। The Daily Campus
  • ২০২৬ সালের মার্চে এই নীতিমালার কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধন করে প্রতিষ্ঠানপ্রধান পদে নিয়োগের জন্য ন্যূনতম ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান হতে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা লাগবে—১০ মার্চ বিকেলে জারি করা পরিপত্রে প্রতিষ্ঠানপ্রধান হতে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। Teachers Portal
  • অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপার, সহকারী সুপার পদে নিয়োগ এখন বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর মাধ্যমে হচ্ছে।বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপার ও সহকারী সুপার পদে নিয়োগ এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। Jugantor
  • শিক্ষকদের জন্য নতুন বদলি নীতিমালা-২০২৬ও জারি হয়েছে, যেখানে একজন শিক্ষক কর্মজীবনে তিনবার বদলির সুযোগ পাবেন।স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য বদলি নীতিমালা, ২০২৬ জারি করা হয়েছে, যেখানে একজন শিক্ষক কর্মজীবনে তিনবার বদলির সুযোগ পাবেন। Jugantor

তাই কারও যদি সার্ভিস রেকর্ড ২০২১ নীতিমালার সময়কার হয়, তাহলে চূড়ান্ত হিসাবের আগে ২০২৫ নীতিমালা ও তার ২০২৬ সালের সংশোধনী দুটোই মিলিয়ে দেখতে হবে।

৫. প্রধান শিক্ষক পদের গ্রেড কাঠামো

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পদের নিজস্ব নির্ধারিত (পদগত) গ্রেড এরকম—

পদগ্রেডমূল বেতন (শুরুতে)
অধ্যক্ষ (ডিগ্রি কলেজ)৪র্থ৫০,০০০ টাকা
উপাধ্যক্ষ / প্রধান শিক্ষক (মাধ্যমিক)৭ম২৯,০০০ টাকা
সহকারী অধ্যাপক৬ষ্ঠ৩৫,৫০০ টাকা
সহকারী প্রধান শিক্ষক৮ম
প্রভাষক (কলেজ)৯ম২২,০০০ টাকা
সহকারী শিক্ষক (বিএডসহ / সিনিয়র শিক্ষক-পূর্ব)১০ম১৬,০০০ টাকা
সহকারী শিক্ষক (বিএড ছাড়া)১১তম১২,৫০০ টাকা

উপাধ্যক্ষ/প্রধান শিক্ষক পদটি ৭ম গ্রেডভুক্ত, যেখানে মূল বেতন শুরু হয় ২৯,০০০ টাকা থেকে, আর সহকারী শিক্ষক বিএডসহ ১০ম গ্রেডে (১৬,০০০ টাকা) এবং বিএড ছাড়া ১১তম গ্রেডে (১২,৫০০ টাকা) যোগ দেন। Bdgovtnotice

এখানে লক্ষণীয়, এই নিবন্ধের আলোচনা বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক/নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ সম্পূর্ণ আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর অধীন এবং সেখানকার গ্রেড-নিয়ম এই নিবন্ধের আওতায় পড়ে না।

৬. প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর কি আবার উচ্চতর গ্রেড বা বিএড স্কেল পাওয়া যায়

এখানেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ওঠে। উত্তরটা বুঝতে হলে একটা যুক্তি স্পষ্ট রাখতে হবে—

কলেজের ক্ষেত্রে নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও সহকারী অধ্যাপক ব্যতীত বাকি সবাই (প্রভাষক, প্রদর্শক ইত্যাদি) উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হবেন।কলেজের ক্ষেত্রে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও সহকারী অধ্যাপক ব্যতীত সবাই উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হবেন। অর্থাৎ, যে পদগুলো ইতিমধ্যে জ্যেষ্ঠতা-ভিত্তিক পদোন্নতি বা নিয়োগের মাধ্যমে একটি ঊর্ধ্বতন, স্বতন্ত্র পদগত গ্রেডে পৌঁছে গেছে, সেগুলো আর সময়ভিত্তিক উচ্চতর গ্রেডের সিঁড়িতে থাকে না—কারণ পদটাই ইতিমধ্যে “ঊর্ধ্বগমন”। Infobookbd

স্কুলের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য: প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ নিজেই একটি জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক নিয়োগ/পদোন্নতির ফসল, এবং তাদের একটি স্বতন্ত্র পদগত গ্রেড (৭ম/৮ম) নির্ধারিত আছে। তাই—

  • প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর নতুন করে “বিএড স্কেল” নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না—কারণ তিনি ইতিমধ্যে ১০ম গ্রেডের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে ৭ম গ্রেডে অবস্থান করছেন।
  • প্রধান শিক্ষক পদে থেকে সময়ভিত্তিক উচ্চতর গ্রেডের (৯ম/৮ম গ্রেডের) নতুন হিসাব সাধারণত প্রযোজ্য হয় না, কারণ তিনি সিনিয়র শিক্ষক/উচ্চতর গ্রেড সিঁড়ির বাইরে একটি পদগত গ্রেডে অবস্থান করছেন।

তবে এর মানে এই নয় যে তার আগের চাকরির ইতিহাস মুছে যায়। সহকারী শিক্ষক থাকাকালীন তিনি যা অর্জন করেছেন—মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, প্রাপ্ত উচ্চতর গ্রেড—সবকিছু প্রধান শিক্ষক পদে বেতন ফিক্সেশন-এর সময় ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৭. পরিস্থিতিভিত্তিক সারসংক্ষেপ

শিক্ষকের অবস্থাপ্রাপ্য গ্রেড/স্কেলব্যাখ্যা
সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ (বিএডসহ, ১৮+ বছর অভিজ্ঞতা)৭ম গ্রেড (পদগত)পদের নির্ধারিত গ্রেডেই বেতন নির্ধারিত হবে
সহকারী শিক্ষক (বিএড স্কেলপ্রাপ্ত) থেকে প্রধান শিক্ষক পদোন্নতি৭ম গ্রেড, পূর্বের বেতনের ভিত্তিতে ফিক্সেশনবিএড স্কেলের ইতিহাস সার্ভিস বুকে থাকবে, নতুন করে বিএড স্কেল দাবি করা যাবে না
সহকারী শিক্ষক (আগে একটি/দুটি উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন) থেকে প্রধান শিক্ষক৭ম গ্রেড, ফিক্সেশনে পূর্বের সুবিধা বিবেচ্যপূর্বের উচ্চতর গ্রেড সরাসরি ৭ম গ্রেডের সঙ্গে “যোগ” হবে না
প্রধান শিক্ষক পদে দীর্ঘ সময় (১০+ বছর) কর্মরতসাধারণত নতুন উচ্চতর গ্রেড প্রযোজ্য নয়প্রধান শিক্ষক পদ উচ্চতর গ্রেড সিঁড়ির বাইরে, কলেজের অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষের মতোই
বিএড ছাড়া প্রধান শিক্ষক নিয়োগ (বিশেষ ক্ষেত্র)৭ম গ্রেড (পদগত)পরে বিএড অর্জন করলেও তা প্রধান শিক্ষক পদে আলাদা স্কেল তৈরি করে না

৮. একটি ভুল ব্যাখ্যা যা এড়িয়ে চলা জরুরি

“৭ম গ্রেড + ১০ম গ্রেড = নতুন কোনো গ্রেড” — এই ধরনের গাণিতিক যোগফলের কোনো ভিত্তি নেই। বেতন গ্রেড ক্রমিক পদগত কাঠামো অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, যোগ-বিয়োগ করে নয়। বিএড স্কেল বা পূর্বের উচ্চতর গ্রেড প্রধান শিক্ষক পদের সঙ্গে সরাসরি “যোগ” হয় না—এগুলো শুধু বেতন ফিক্সেশন প্রক্রিয়ায় পূর্ববর্তী মূল বেতন গণনার সময় বিবেচিত হয়।

৯. হিসাব করার সহজ ৫-ধাপের সূত্র

নিজের বা কোনো শিক্ষকের সঠিক অবস্থান বুঝতে এই ক্রম অনুসরণ করুন—

  1. প্রথম এমপিও তারিখ বের করুন।
  2. বিএড স্কেল কার্যকরের তারিখ বের করুন (সনদ প্রাপ্তির তারিখ নয়, স্কেল অনুমোদনের সরকারি আদেশের তারিখ)।
  3. এই বিএড স্কেল/১০ম গ্রেড প্রাপ্তির তারিখ থেকে ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে কি না দেখুন—হলে সিনিয়র শিক্ষক (৯ম গ্রেড) প্রযোজ্য কি না যাচাই করুন।
  4. আগে কোনো উচ্চতর গ্রেড (৯ম/৮ম) পেয়েছেন কি না এবং কবে পেয়েছেন লিখে রাখুন।
  5. প্রধান শিক্ষক পদে যোগদানের তারিখ ও ধরন (সরাসরি নিয়োগ নাকি পদোন্নতি) দেখে সংশ্লিষ্ট বেতন ফিক্সেশন আদেশ যাচাই করুন।

১০. বাস্তব উদাহরণ

শিক্ষক রহিম

ঘটনাতারিখ
সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান১ জানুয়ারি ২০১০
প্রথম এমপিও১ জুলাই ২০১০
বিএড অর্জন১ জুলাই ২০১৪
বিএড স্কেল কার্যকর (১০ম গ্রেড)১ জানুয়ারি ২০১৫
প্রথম উচ্চতর গ্রেড (৯ম, সিনিয়র শিক্ষক)১ জানুয়ারি ২০২৫ (বিএড স্কেলের তারিখ থেকে ১০ বছর)
প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ (১৮ বছর অভিজ্ঞতা পূর্ণ করে)১ জানুয়ারি ২০২৮

এখানে ভুল হবে যদি কেউ বলে “২০১০ সালের এমপিও থেকে ১০ বছর, তাই ২০২০ সালে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার কথা।” সঠিক গণনা শুরু হয় ২০১৫ সালের বিএড স্কেলের তারিখ থেকে, ফলে প্রথম উচ্চতর গ্রেড আসবে ২০২৫ সালে, ২০২০ সালে নয়। আবার প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর (২০২৮) তার এই ২০১৫ ও ২০২৫ সালের ইতিহাস মুছে যাবে না—নতুন পদের বেতন ফিক্সেশনে সেগুলো ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু প্রধান শিক্ষক পদে নতুন করে “উচ্চতর গ্রেড” বা “বিএড স্কেল” দাবি করার সুযোগ নেই।

১১. সাধারণ ভুল ধারণা ও প্রকৃত অবস্থা

ভুল ধারণাপ্রকৃত অবস্থা
বিএড করলেই ১০ম গ্রেড পাওয়া যায়সনদ অর্জন যথেষ্ট নয়; এমপিও শিটে স্কেল অনুমোদিত হয়ে কার্যকর হতে হয়
এমপিওভুক্তির তারিখ থেকেই সবসময় ১০ বছর গণনা হয়বিএড আবশ্যিক পদে গণনা শুরু হয় বিএড স্কেল/১০ম গ্রেড প্রাপ্তির তারিখ থেকে
১০ বছর হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরোনো অর্থে টাইম স্কেল মেলে২০১৫ সালে পুরোনো টাইম স্কেল বিলুপ্ত; এখন উচ্চতর গ্রেড/সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতির বিধান প্রযোজ্য
প্রধান শিক্ষক হলে বিএড স্কেল ৭ম গ্রেডের সঙ্গে “যোগ” হয়গ্রেড গাণিতিক যোগফল নয়; প্রধান শিক্ষক তার পদের নির্ধারিত ৭ম গ্রেডেই থাকবেন
প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর আগের সব বেতন-ইতিহাস বাতিলপূর্বের বেতন ও স্কেল ফিক্সেশনের সময় বিবেচ্য থাকে
প্রধান শিক্ষক পদে থেকেও নিয়মিত উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবেকলেজের অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষের মতোই প্রধান শিক্ষক পদ সাধারণত উচ্চতর গ্রেড সিঁড়ির বাইরে
চাকরির যেকোনো মেয়াদেই প্রধান শিক্ষক হওয়া যায়২০২৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানপ্রধান পদে ন্যূনতম ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা লাগে

১২. প্রধান শিক্ষক ও প্রধান-শিক্ষক-প্রার্থী শিক্ষকদের জন্য করণীয়

নিজের একটি স্কেল-হিসাব ফাইল তৈরি করুন, যাতে থাকবে—

  1. প্রথম নিয়োগ ও যোগদানের কপি
  2. প্রথম এমপিও শিট
  3. বিএড সনদ ও বিএড স্কেল মঞ্জুরির সরকারি আদেশ
  4. প্রাপ্ত উচ্চতর গ্রেড/সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতির আদেশ (যদি থাকে)
  5. প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির আদেশ (এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে হলে তার প্রমাণপত্রসহ)
  6. নতুন পদে বেতন ফিক্সেশন বিবরণী
  7. সার্ভিস বুকের হালনাগাদ পৃষ্ঠা
  8. সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর পরিপত্র/স্পষ্টীকরণের কপি

জেলা/উপজেলা শিক্ষা অফিস বা হিসাবরক্ষণ অফিসে গেলে শুধু মৌখিকভাবে দাবি না করে এই কাগজপত্র একসঙ্গে নিয়ে যাওয়া সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।

শেষ কথা

বিএড স্কেল যোগ্যতাভিত্তিক সুবিধা, উচ্চতর গ্রেড/সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতি মেয়াদভিত্তিক সুবিধা, আর প্রধান শিক্ষক পদের নিজস্ব একটি নির্ধারিত পদগত গ্রেড (৭ম) আছে—এই তিনটি আলাদা জিনিস। ১০ বছরের গণনা সাধারণত বিএড স্কেল/১০ম গ্রেড প্রাপ্তির তারিখ থেকে শুরু হয়, প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে নয়। প্রধান শিক্ষক পদে যাওয়ার পর নতুন করে বিএড স্কেল বা নিয়মিত উচ্চতর গ্রেডের প্রশ্ন সাধারণত ওঠে না, কারণ পদটি ইতিমধ্যে জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক ঊর্ধ্বগমনের ফল—তবে আগের বেতন-ইতিহাস নতুন পদের ফিক্সেশনে বিবেচিত হয়।

নীতিমালা সময়ে সময়ে সংশোধিত হয়—২০২১ থেকে ২০২৫ নীতিমালা, আর তার ২০২৬ সালের সংশোধনী (১৮ বছরের অভিজ্ঞতা শর্ত, এনটিআরসিএ-নির্ভর নিয়োগ, নতুন বদলি নীতিমালা) তার সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ। তাই কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষকের চূড়ান্ত আর্থিক পাওনা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর সর্বশেষ এমপিও নীতিমালা, মাউশি/শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিপত্র এবং ব্যক্তিগত সার্ভিস ও এমপিও রেকর্ডকেই চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে ধরতে হবে।

Last Updated on 1 hour ago by Asiful Haque

Md Asiful Haque

লেখক: মো. আসিফুল হক

সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
৪৩তম বিসিএস (প্রশাসন ক্যাডার)
কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়

শিক্ষা: MBA (IBA), BSc in CSE (BUET)

বিসিএস পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর সরকারি প্রশাসনে যোগদান করেছি ২০২৫ সালে। প্রতিদিন মাঠ পর্যায়ে সংবিধান, আইন, ও প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রয়োগ করার অভিজ্ঞতা থেকে লিখি এই ব্লগ।

Leave a comment