প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৬: প্রধান শিক্ষকের প্রস্তুতি ও করণীয়ের সম্পূর্ণ গাইড

Contents hide

দীর্ঘ বিরতির পর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নতুন নীতিমালায় ফিরে আসছে। এই নীতিমালা ২০২৬ সালের ৯ মার্চ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করেছে এবং একই দিনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তা প্রকাশ করে। বিদ্যালয় পর্যায়ে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দায়িত্ব মূলত প্রধান শিক্ষকের ওপরই বর্তায়। এই লেখায় নীতিমালার প্রতিটি অংশ সরকারি সূত্র ধরে যাচাই করে প্রধান শিক্ষকের জন্য একটি সম্পূর্ণ, নির্ভুল ও বাস্তবায়নযোগ্য গাইডলাইন সাজানো হলো।

১. প্রথমেই বুঝে নিন: কোন পরীক্ষা কখন হচ্ছে

এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে সময়রেখা নিয়ে। বাস্তবে দুটি আলাদা চক্র চলছে, আর এই দুটিকে গুলিয়ে ফেললে প্রধান শিক্ষকের প্রস্তুতি পরিকল্পনাই ভুল দিকে চলে যাবে।

চক্রপরীক্ষার্থীপরীক্ষার সময়ফলাফলবর্তমান অবস্থা
২০২৫ সালের পরীক্ষা (স্থগিত হয়ে পরে অনুষ্ঠিত)তৎকালীন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী১৫–১৮ এপ্রিল ২০২৬১২ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিতসম্পন্ন, বৃত্তির অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়াধীন
২০২৬ সালের পরীক্ষা (এই লেখার মূল বিষয়)বর্তমান পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী২০, ২১, ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর ২০২৬পরীক্ষার পরে যথাসময়েপ্রস্তুতি পর্যায়ে

২০২৩ ও ২০২৪ সালে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হলেও ২০২৫ সালের নির্ধারিত পরীক্ষাটি সে সময় অনুষ্ঠিত হয়নি; পরে সেটিই একই নীতিমালার আলোকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয়, এবং সাড়ে ছয় লাখ শিক্ষার্থীর ফলাফল যাচাই-বাছাই শেষে প্রকাশিত হয়। ফল প্রকাশের দিন জানা যায়, মোট ৭৯ হাজার ২৪৬ শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে, যার মধ্যে ট্যালেন্টপুলে ৩২ হাজার ৯৬৫ জন এবং সাধারণ বৃত্তিতে ৪৬ হাজার ২৮১ জন। আপনার বিদ্যালয়ে যদি এখনো ২০২৫ চক্রের বৃত্তির অর্থ-সংক্রান্ত কাজ বাকি থাকে, সেটি আলাদাভাবে সম্পন্ন করুন। এই গাইডের মূল আলোচ্য বিষয় হলো ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষা, যার জন্য আপনার বর্তমান পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে।

প্রাথমিক বৃত্তি বনাম জুনিয়র বৃত্তি: একই নিয়ম নয়

বাজারে প্রচলিত অনেক লেখায় প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ও অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার তথ্য মিশিয়ে ফেলা হয়। দুটির শ্রেণি, কর্তৃপক্ষ, নীতিমালা ও অর্থের হার সম্পূর্ণ আলাদা। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা পরিচালনা করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য; জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা মাধ্যমিক পর্যায়ের এবং অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। প্রধান শিক্ষক হিসেবে আপনার বিদ্যালয়ে যে স্তরের পরীক্ষা প্রযোজ্য, শুধু সেই নীতিমালাই অনুসরণ করুন।

২. নীতিমালা ২০২৬-এর মূল কাঠামো

নীতিমালা প্রকাশের পরপরই প্রশ্নপত্রের কাঠামোও প্রকাশিত হয়, যেখানে ২০২৬ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের অনুমোদিত কাঠামো তুলে ধরা হয়। এই নীতিমালার আওতায় থাকা মূল বিষয়গুলো নিচে দেওয়া হলো।

অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা ও নির্বাচন

  • সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক।
  • চতুর্থ শ্রেণির বার্ষিক (সামষ্টিক) মূল্যায়নের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতি শ্রেণি থেকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
  • এই সীমা সর্বোচ্চ ৪০% — অর্থাৎ প্রতিটি বিদ্যালয় নিজস্ব মেধাক্রম অনুযায়ী এর মধ্যে যত জনকে যোগ্য মনে করে তত জনকেই মনোনীত করতে পারে, তবে ৪০ শতাংশের বেশি নয়।

বৃত্তি ও কোটার কাঠামো

নীতিমালা অনুযায়ী দুই ধরনের বৃত্তি দেওয়া হয়: ট্যালেন্টপুল এবং সাধারণ। উভয় ক্ষেত্রেই মোট বৃত্তির ৫০ শতাংশ ছাত্র এবং ৫০ শতাংশ ছাত্রীর জন্য সংরক্ষিত থাকবে, আর মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ পাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং বাকি ২০ শতাংশ পাবে বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

কোটার ধরনবণ্টন
লিঙ্গভিত্তিক কোটাছাত্র ৫০% + ছাত্রী ৫০% (উভয় ক্যাটাগরিতে)
বিদ্যালয়ভিত্তিক কোটাসরকারি বিদ্যালয় ৮০% + বেসরকারি বিদ্যালয় ২০%
শ্রেণি থেকে নির্বাচনের সীমাসর্বোচ্চ ৪০% (চতুর্থ শ্রেণির ফলের ভিত্তিতে)

৩. প্রশ্নপত্রের প্রকৃত কাঠামো: ৫টি বিষয়, কিন্তু ৪টি পরীক্ষা

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, যা সাধারণত ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়। মোট বিষয় পাঁচটি হলেও পরীক্ষা নেওয়া হয় চারটি পত্রে, কারণ বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়— এই দুই বিষয় মিলিয়ে একই পত্রে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হয়।

মানবণ্টন সারণি

পত্রবিষয়পূর্ণমানসময়
১বাংলা১০০২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট
২ইংরেজি১০০২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট
৩প্রাথমিক গণিত১০০২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট
৪প্রাথমিক বিজ্ঞান (৫০) + বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (৫০)১০০২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট
মোট৪০০৪ দিনে ৪ পত্র

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা প্রতিটি পত্রে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় পাবে। বৃত্তি পাওয়ার জন্য প্রতিটি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। এই শেষ শর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়ই আলোচনা থেকে বাদ পড়ে যায়— একজন শিক্ষার্থীর সার্বিক গড় নম্বর ভালো হলেও কোনো একটি বিষয়ে ৪০ শতাংশের নিচে নম্বর পেলে সে বৃত্তির জন্য বিবেচিত হবে না। প্রধান শিক্ষকের প্রস্তুতি পরিকল্পনায় তাই “দুর্বল বিষয়” চিহ্নিত করে সেটিকে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বরের সীমার ওপরে তোলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, শুধু সার্বিক গড় নম্বর বাড়ানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়।

৪. বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নের নির্ভুল কাঠামো (নেপ অনুমোদিত)

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) প্রতিটি বিষয়ের প্রশ্নের ধরন ও উপ-নম্বর বণ্টন প্রকাশ করেছে। এই কাঠামো জানা থাকলে প্রধান শিক্ষক ও বিষয় শিক্ষক নির্দিষ্ট করে মডেল টেস্ট সাজাতে পারবেন।

বাংলা (পূর্ণমান ১০০, সময় ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট)

প্রশ্নের ধরনসংখ্যা ও উত্তরনম্বর
কবিতার নামসহ প্রথম ৮ পঙ্‌ক্তি লিখন১টি থেকে ১টি১০
শব্দার্থ লিখন৫টি থেকে ৫টি৫
বাক্য গঠন৫টি থেকে ৫টি৫
শূন্যস্থান পূরণ৫টি থেকে ৫টি৫
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন৫টি থেকে ৫টি৫
বিপরীত/সমার্থক শব্দ৫টি থেকে ৫টি৫
সংক্ষিপ্ত উত্তর (২ নম্বর করে)৪টি থেকে ৪টি৮
সংক্ষিপ্ত উত্তর (৫ নম্বর করে)৩টি থেকে ৩টি১৫
কবিতা/গদ্যের মূলভাব লিখন১টি থেকে ১টি৫
ভাষারীতি/পদ নির্ণয়/ক্রিয়ার কাল৫টি থেকে ৫টি৫
অনুচ্ছেদ পড়ে প্রশ্ন তৈরি/বিরামচিহ্ন প্রয়োগ৫টি থেকে ৫টি৫
যুক্তবর্ণ বিভাজন ও শব্দ গঠন৫টি থেকে ৫টি৫
এককথায় প্রকাশ৫টি থেকে ৫টি৫
ফরম পূরণ/আবেদনপত্র লিখন১টি থেকে ১টি৫
রচনা লিখন১টি থেকে ১টি১২

প্রশ্নপত্রে জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক, প্রয়োগমূলক ও উচ্চতর দক্ষতামূলক— এই চার ধরনের ডোমেইন থেকেই প্রশ্ন থাকবে।

ইংরেজি (পূর্ণমান ১০০, সময় ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট)

পাঠ্যবই “English for Today” (Class V) থেকে সিন প্যাসেজ এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরে থেকে আনসিন প্যাসেজ— দুই ধরনের অনুচ্ছেদ থাকবে।

প্রশ্নের ধরননম্বর
শব্দের অর্থ মেলানো / True-False৫
প্রদত্ত শব্দ দিয়ে অর্থপূর্ণ বাক্য গঠন৫
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (সিন প্যাসেজ, ৬টি)১৮
আনসিন অনুচ্ছেদে শূন্যস্থান পূরণ৫
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (আনসিন, ৩টি)৯
Parts of Speech চিহ্নিতকরণ / Tense পরিবর্তন৫
Prefix-Suffix / a, an, the পূরণ৬
WH Question তৈরি৫
শব্দ বা বাক্য সাজিয়ে অর্থপূর্ণ বাক্য/গল্প তৈরি৭
Capitalization ও Punctuation সংশোধন৫
ফরম পূরণ (সময়, সংখ্যা সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে)৫
সঠিক Verb form দিয়ে বাক্য/অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণকরণ৫
Letter/Application/Email লিখন১০
Short Composition (মুক্ত রচনা বা প্রশ্নের উত্তরভিত্তিক)১০

গণিত (পূর্ণমান ১০০, সময় ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট)

প্রশ্নের ধরননম্বর
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন (১০টি)১০
শূন্যস্থান পূরণ (১০টি)১০
সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন (১৬টি)১৬
চার প্রক্রিয়া-সম্পর্কিত সমস্যা৮
লসাগু-গসাগু-সম্পর্কিত সমস্যা৮
ভগ্নাংশ (সাধারণ/দশমিক)-সম্পর্কিত সমস্যা৮
গড়-সম্পর্কিত সমস্যা৮
শতকরা-সম্পর্কিত সমস্যা৮
পরিমাপ/সময়/ক্ষেত্রফল-সম্পর্কিত সমস্যা৮
জ্যামিতি: চিত্র অঙ্কন ও বৈশিষ্ট্য লিখন৮
উপাত্ত বিন্যস্তকরণ ও জনসংখ্যা-সম্পর্কিত সমস্যা৮

গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা: ৪ থেকে ৯ নম্বর প্রশ্নের ক্ষেত্রে উত্তরপত্রে ধাপে ধাপে সমাধান দেখাতে হবে; শুধু চূড়ান্ত উত্তর লিখলে নম্বর পাওয়া যাবে না। প্রশ্নগুলো একক সমস্যা হিসেবে অথবা ক, খ, গ অংশে বিভক্ত করে আসতে পারে। গণিত শিক্ষকদের এই নিয়মটি শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই অভ্যাস করাতে হবে— উত্তর মুখস্থ করে নয়, ধাপ লিখে অনুশীলন করাতে হবে।

প্রাথমিক বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (পূর্ণমান ৫০+৫০=১০০, সময় ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট)

দুই বিষয়েরই কাঠামো অভিন্ন:

প্রশ্নের ধরননম্বর (প্রতি বিষয়ে)
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন (৫টি)৫
শূন্যস্থান পূরণ/সত্য-মিথ্যা৫
মিলকরণ (৪টি)৪
সংক্ষিপ্ত উত্তর (৬টি)১২
বিস্তৃত উত্তর (৪টি)২৪
উপমোট৫০

৫. পরীক্ষার হলে পালনীয় নির্দেশনা ও আচরণবিধি

নীতিমালায় পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের জন্য দশটি নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের উচিত পরীক্ষার আগে একাধিকবার এগুলো শিক্ষার্থীদের অনুশীলন করানো, শুধু পরীক্ষার দিন মুখে বলে দেওয়া যথেষ্ট নয়।

হলে প্রবেশ ও উত্তরপত্র সংক্রান্ত নিয়ম

  1. প্রবেশপত্র বাধ্যতামূলক — প্রবেশপত্র ছাড়া কেউ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না।
  2. নিষিদ্ধ সামগ্রী — অননুমোদিত কাগজপত্র, ক্যালকুলেটর, মোবাইল ফোন বা যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস আনা যাবে না।
  3. OMR কভার পাতা — নাম, বিষয় কোড ও রোল নম্বর ছাড়া অন্য কিছু লেখা যাবে না।
  4. ইনভিজিলেটরের স্বাক্ষর — উত্তরপত্রে না থাকলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
  5. পরিচয় গোপন রাখা — উত্তরপত্রের ভেতরে বা বাইরে নাম, ঠিকানা, রোল বা কোনো সাংকেতিক চিহ্ন লেখা যাবে না।
  6. খসড়ার নিয়ম — আলাদা কোনো কাগজ দেওয়া হবে না; দেওয়া উত্তরপত্রেই খসড়া করে পরে কেটে দিতে হবে।
  7. লেখার স্থান — টেবিল, স্কেল বা শরীরের কোথাও লেখা যাবে না।
  8. হল ত্যাগের সময়সীমা — প্রশ্নপত্র বিতরণের ১ ঘণ্টা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কেউ হলের বাইরে যেতে পারবে না।
  9. উত্তরপত্র জমাদান — পরীক্ষা শেষে ইনভিজিলেটরের কাছে জমা দিয়েই হল ত্যাগ করতে হবে।
  10. কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত নির্দেশনা মেনে চলা।

পরীক্ষা চলাকালীন আচরণবিধি

  • একে অপরের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ।
  • লিখিত কিছু বিনিময় করা নিষেধ।
  • অন্যের উত্তরপত্র দেখে লেখা বা দেখতে সাহায্য করা নিষেধ।
  • উত্তরপত্র জমা না দিয়ে হল ত্যাগ করা যাবে না।
  • উত্তরপত্রের পাতা ছেঁড়া বা নষ্ট করা যাবে না।

প্রধান শিক্ষকের করণীয়: OMR ফরম পূরণের একটি মডেল কপি সংগ্রহ করে অন্তত দুই-তিনবার অনুশীলন করান, যাতে পরীক্ষার দিন রোল বা কোড ভুল লেখার কারণে খাতা বাতিল না হয়।

৬. বৃত্তির অর্থ: হালনাগাদ হার ও পরিশোধ পদ্ধতি

এই অংশে দুটি ভিন্ন সময়ের ঘোষণা আছে, যা প্রধান শিক্ষকের জানা জরুরি যাতে অভিভাবকদের ভুল তথ্য না দেওয়া হয়।

সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত হার (সর্বশেষ, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা ২০২৬ সাল থেকে পরবর্তী তিন বছর নিম্নোক্ত হারে বৃত্তি পাবেন: ট্যালেন্টপুল বৃত্তিতে মাসিক ৩০০ টাকা এবং বছরে এককালীন ২২৫ টাকা; সাধারণ বৃত্তিতে মাসিক ২২৫ টাকা এবং বছরে এককালীন ২২৫ টাকা।

বৃত্তির ধরনমাসিক হারবার্ষিক এককালীনমেয়াদ
ট্যালেন্টপুল৩০০ টাকা২২৫ টাকা৩ বছর
সাধারণ২২৫ টাকা২২৫ টাকা৩ বছর

একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি, যা প্রধান শিক্ষকের জানা দরকার

এর আগে, ফলাফল প্রকাশের দিনই শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংবাদ সম্মেলনে জানান, চলতি বছর থেকে ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ উভয় বৃত্তির অর্থ দ্বিগুণ করা হচ্ছে— ট্যালেন্টপুলে বছরে মোট ৭ হাজার ৬৫০ টাকা (এককালীন ৪৫০ + মাসিক ৬০০) এবং সাধারণে বছরে মোট ৫ হাজার ৮৫০ টাকা (এককালীন ৪৫০ + মাসিক ৪৫০)।

মন্ত্রীর জুলাইয়ের এই ঘোষণা আর সেপ্টেম্বরের সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত হারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য আছে— প্রজ্ঞাপনে পুরোনো (অ-দ্বিগুণ) হারই বহাল রাখা হয়েছে। এর মানে হতে পারে, মন্ত্রীর ঘোষিত বর্ধিত হার ভবিষ্যতে (সম্ভবত ডিসেম্বর ২০২৬-এর পরীক্ষার্থীদের জন্য) কার্যকর হবে, অথবা প্রজ্ঞাপনটি এখনো চূড়ান্ত রূপ নেয়নি। প্রধান শিক্ষকের করণীয়: অভিভাবক সভায় নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক ঘোষণা করার আগে সর্বশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপন বা সার্কুলার (dpe.gov.bd বা mopme.gov.bd-এ) যাচাই করে নিন, কারণ অর্থের হার পরিবর্তিত হচ্ছে।

পরিশোধ পদ্ধতি: G2P/EFT

২০১৯-২০ অর্থবছর থেকেই রাজস্ব খাতভুক্ত সব ধরনের বৃত্তির অর্থ G2P পদ্ধতিতে EFT-এর মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হচ্ছে— এটি ২০২৬ সালের নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি প্রক্রিয়া। তাই অভিভাবকদের এটিকে “নতুন সুবিধা” হিসেবে না বলে বরং “বিদ্যমান পদ্ধতি” হিসেবে জানানোই সঠিক।

ব্যাংক হিসাব যাচাইয়ে করণীয়:

  • হিসাব ব্যক্তিগত না যৌথ, তা নিশ্চিত করুন।
  • যৌথ হিসাবের ক্ষেত্রে সিস্টেমে নাম এন্ট্রি করার নিয়ম হলো— প্রথমে শিক্ষার্থীর নাম, তারপর “and”, তারপর দ্বিতীয় হিসাবধারীর নাম (ইংরেজিতে)।
  • শিক্ষার্থীর নামের বানান জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে নিন।

৭. IPEMIS-এ তথ্য এন্ট্রি: প্রধান শিক্ষকের প্রযুক্তিগত দায়িত্ব

২০২৫ সালের বৃত্তি পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদের তথ্য (DR) IPEMIS সফটওয়্যারে এন্ট্রি, যাচাই ও অনুমোদন, পরীক্ষা কেন্দ্র নির্বাচন, পরীক্ষক-নিরীক্ষক-প্রধান পরীক্ষক এন্ট্রি এবং প্রবেশপত্র প্রিন্টের নির্দেশনা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রকাশ করেছিল। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পরীক্ষার আগেও একই ধরনের নোটিশ আসবে বলে ধরে নেওয়া যায়। প্রধান শিক্ষকের এই ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:

  1. IPEMIS-এ স্কুল ও শিক্ষার্থী তথ্য হালনাগাদ আছে কি না যাচাই করুন — জন্মতারিখ, নাম, পিতামাতার নাম, ব্যাংক হিসাব নম্বর।
  2. পরীক্ষার্থী তথ্য (DR) এন্ট্রি করুন — নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে, উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসের অনুমোদনের জন্য।
  3. এন্ট্রি করা তথ্য যাচাই ও প্রিন্ট করে আরেকবার মিলিয়ে দেখুন — সিস্টেমে ভুল থাকলে সংশোধনের সময়সীমা সংক্ষিপ্ত থাকে।
  4. প্রবেশপত্র প্রিন্ট — নির্ধারিত সময়ে সিস্টেম থেকে সংগ্রহ ও বিতরণ করুন।
  5. কেন্দ্র ও পরীক্ষক তথ্য — বিদ্যালয় কেন্দ্র হলে পরীক্ষক, নিরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকের তথ্যও যথাসময়ে এন্ট্রি করতে হবে।

৮. প্রধান শিক্ষকের সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (ডিসেম্বর ২০২৬ পরীক্ষার জন্য)

আজকের তারিখ (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) থেকে পরীক্ষার (২০ ডিসেম্বর) মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় আছে। এই সময়কে চারটি ধাপে ভাগ করা যায়:

সময়কালমূল কাজ
সেপ্টেম্বর (এখনই)নীতিমালা ও প্রশ্নকাঠামো শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ, প্রস্তুতি কমিটি গঠন, ৪০% কোটার আলোকে সম্ভাব্য তালিকা তৈরি
অক্টোবরপূর্ণাঙ্গ শিক্ষার্থী তথ্য যাচাই, IPEMIS-এ DR এন্ট্রি শুরু, বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়ভিত্তিক ক্লাস টেস্ট
নভেম্বরপূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট (উপরের কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি পত্র আলাদাভাবে), OMR অনুশীলন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ক্লাস
৮–১৯ ডিসেম্বরপ্রবেশপত্র বিতরণ, কেন্দ্র প্রস্তুতি, শেষ রিভিশন, অভিভাবক সভা
২০–২৩ ডিসেম্বরপরীক্ষা পরিচালনা
পরীক্ষা-পরবর্তীনথি সংরক্ষণ, ফলাফলের অপেক্ষা, বৃত্তিপ্রাপ্তদের ব্যাংক তথ্য প্রস্তুত রাখা

বিদ্যালয়ে প্রস্তুতি কমিটি

দায়িত্বদায়িত্বপ্রাপ্ত
নীতিমালা ও সরকারি নোটিশ সংগ্রহ, IPEMIS তদারকিপ্রধান শিক্ষক
শিক্ষার্থী তথ্য যাচাইশ্রেণিশিক্ষক
বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি (বাংলা/ইংরেজি/গণিত/বিজ্ঞান-বিবিপ)সংশ্লিষ্ট বিষয় শিক্ষক
দুর্বল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তানির্ধারিত শিক্ষক
অভিভাবক যোগাযোগশ্রেণিশিক্ষক
ব্যাংক হিসাব ও নথি সংরক্ষণপ্রধান শিক্ষক/অফিস সহায়ক

প্রতি সপ্তাহে ১৫–২০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা সভায় আলোচনা করুন: কোন বিষয়ে দুর্বলতা বেশি, প্রতি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ শতাংশের নিচে কারা আছে, এবং নতুন কোনো সরকারি নির্দেশনা এসেছে কি না।

৯. একাডেমিক প্রস্তুতিতে বিষয়ভিত্তিক অগ্রাধিকার

উপরের নেপ-অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বরের প্রশ্নগুলোতে বিশেষ মনোযোগ দিন:

  • বাংলা: রচনা লিখন (১২ নম্বর) এবং ৫ নম্বরের তিনটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (মোট ১৫ নম্বর) সবচেয়ে বেশি নম্বর বহন করে— এই দুই অংশে নিয়মিত লিখিত অনুশীলন করান।
  • ইংরেজি: Letter/Application/Email (১০) এবং Short Composition (১০) মিলিয়ে মোট ২০ নম্বর— মুক্ত লেখার অভ্যাস তৈরি করুন, শুধু মুখস্থ নমুনায় নির্ভর করবেন না।
  • গণিত: ৪ থেকে ১১ নম্বর প্রশ্নের প্রতিটি ৮ নম্বর করে, মোট ৬৪ নম্বর— এবং ধাপে ধাপে সমাধান দেখাতে না পারলে নম্বর কাটা যায়। তাই “গণিত ভুল বিশ্লেষণ খাতা” চালু করে প্রতিটি ধাপ লেখার অভ্যাস তৈরি করুন।
  • বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ-বিশ্বপরিচয়: প্রতিটি বিষয়ে বিস্তৃত উত্তরের প্রশ্ন (২৪ নম্বর) সবচেয়ে ভারী অংশ— ধারণা বুঝে লেখার দক্ষতা তৈরি করুন, শুধু তথ্য মুখস্থ যথেষ্ট নয়।

১০. শিক্ষার্থী তথ্য যাচাই চেকলিস্ট

যাচাইয়ের বিষয়কী মেলাতে হবে
শিক্ষার্থীর নামজন্মনিবন্ধন/NID-এর বানানের সঙ্গে
পিতা-মাতার নামজন্মনিবন্ধনের সঙ্গে
জন্মতারিখবিদ্যালয় রেজিস্টার ও IPEMIS রেকর্ডের সঙ্গে
শ্রেণি ও রোলচলতি বছরের রেকর্ডের সঙ্গে
ব্যাংক হিসাব নম্বরহিসাবধারীর নামসহ (একক/যৌথ)
বিদ্যালয়ের নাম ও কোডIPEMIS-এর সঙ্গে

শ্রেণিশিক্ষক প্রথমে যাচাই করবেন, প্রধান শিক্ষক দ্বিতীয়বার মিলিয়ে দেখবেন, এবং চূড়ান্ত এন্ট্রির আগে আরেকবার প্রিন্ট করে যাচাই করবেন।

১১. যেসব ভুল এড়িয়ে চলতে হবে

ভুলসংশোধন
২০২৫ ও ২০২৬ চক্রের তথ্য গুলিয়ে ফেলাপ্রতিটি নোটিশের তারিখ ও ব্যাচ যাচাই করে আলাদা ফাইলে রাখুন
প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তির নিয়ম এক করাশ্রেণি ও কর্তৃপক্ষ যাচাই করে নীতিমালা আলাদা রাখুন
বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ-বিশ্বপরিচয়কে আলাদা পত্র মনে করাএই দুই বিষয় একই পত্রে ৫০+৫০=১০০ নম্বরে হয়, সময়সূচি সেভাবেই সাজান
গণিতে শুধু উত্তর লিখতে বলা৪-১১ নম্বর প্রশ্নে ধাপে ধাপে সমাধান লেখার অভ্যাস করান
গড় নম্বরের ওপর ভরসা করাপ্রতিটি বিষয়ে আলাদাভাবে ৪০% নম্বরের সীমা অতিক্রম করছে কি না দেখুন
বৃত্তির টাকার অঙ্ক নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করামন্ত্রীর ঘোষণা ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের অসংগতি থাকায় সর্বশেষ সার্কুলার যাচাই করুন

উপসংহার

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৬-এর প্রস্তুতি সফল করতে হলে প্রধান শিক্ষকের কাজ তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দরকার। প্রথমত, সঠিক সময়রেখা মেনে চলা— ২০২৫ চক্র ও ২০২৬ চক্রকে গুলিয়ে না ফেলা। দ্বিতীয়ত, নেপ-অনুমোদিত প্রকৃত প্রশ্নকাঠামো অনুযায়ী প্রস্তুতি সাজানো, বিশেষত ৪০ শতাংশ ন্যূনতম নম্বরের শর্ত মাথায় রেখে। তৃতীয়ত, IPEMIS-ভিত্তিক তথ্য এন্ট্রি ও ব্যাংক তথ্য যাচাইয়ের প্রশাসনিক কাজ যথাসময়ে ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা। বৃত্তির অর্থের হারের মতো যেসব বিষয়ে সরকারি ঘোষণায় এখনো অসংগতি আছে, সেখানে অনুমাননির্ভর তথ্য না দিয়ে সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Last Updated on 1 month ago by Asiful Haque

Md Asiful Haque

লেখক: মো. আসিফুল হক

সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
৪৩তম বিসিএস (প্রশাসন ক্যাডার)
কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়

শিক্ষা: MBA (IBA), BSc in CSE (BUET)

বিসিএস পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর সরকারি প্রশাসনে যোগদান করেছি ২০২৫ সালে। প্রতিদিন মাঠ পর্যায়ে সংবিধান, আইন, ও প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রয়োগ করার অভিজ্ঞতা থেকে লিখি এই ব্লগ।

Leave a comment