সন্ধি বিচ্ছেদ সহজে মনে রাখার ৫টি নিয়ম

বিসিএস প্রিলি ও লিখিত, ব্যাংক নিয়োগ, এনটিআরসিএ, প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ, রেলওয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা—প্রায় প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষার বাংলা অংশে সন্ধি বিচ্ছেদ থেকে ১-২টি প্রশ্ন থাকেই। প্যাটার্ন সীমিত, শব্দভাণ্ডারও পুনরাবৃত্তিমূলক। নিচের ৫টি নিয়ম প্রয়োগ করলে প্রশ্নের বড় অংশ নির্ভুল উত্তর করা যায়।

সন্ধি কাকে বলে

পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধ্বনির মিলনে যে পরিবর্তন ঘটে (একটি ধ্বনি লোপ পায়, দুটি মিলে একটি নতুন ধ্বনি হয়, বা একটি অন্যটির প্রভাবে বদলে যায়), তাকে সন্ধি বলে। যেমন বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়। সন্ধি বিচ্ছেদ মানে এই প্রক্রিয়াটি উল্টো দিকে করা, অর্থাৎ মিলিত শব্দ থেকে মূল দুটি অংশ আলাদা করা।

সন্ধির শ্রেণিবিভাগ আগে চিনে নিন

শ্রেণিউপপ্রকারবিসর্গ সন্ধি আছে কি
বাংলা সন্ধিস্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধিনা
তৎসম (সংস্কৃত) সন্ধিস্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি, বিসর্গসন্ধিহ্যাঁ

শব্দটি তৎসম (সংস্কৃত থেকে আসা, যেমন মনোহর, দুঃখ) না বাংলা (দেশি বা তদ্ভব, যেমন মাথাব্যথা) তা প্রথমে বুঝে নিলে ভুল কমে। বাংলা সন্ধিতে বিসর্গ কখনো আসে না, তাই “নিঃশব্দ”-এর মতো শব্দ তৎসম বলেই বিসর্গ পাওয়া যায়।


নিয়ম ১: স্বরসন্ধির ৭টি রূপান্তর মুখস্থ করুন

স্বরসন্ধিতে পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে। প্রথম শব্দের শেষ স্বর ও দ্বিতীয় শব্দের প্রথম স্বর মিলে কী হয়, সেই সাতটি নিয়ম মনে রাখলেই যথেষ্ট।

প্রথম স্বর + দ্বিতীয় স্বরফলউদাহরণ
অ/আ + অ/আনর + অধম = নরাধম; হিম + আলয় = হিমালয়; মহা + আশয় = মহাশয়
অ/আ + ই/ঈশুভ + ইচ্ছা = শুভেচ্ছা; নর + ইন্দ্র = নরেন্দ্র; দেব + ইন্দ্র = দেবেন্দ্র
অ/আ + উ/ঊসূর্য + উদয় = সূর্যোদয়; মহা + উৎসব = মহোৎসব; পর + উপকার = পরোপকার
অ/আ + ঋঅর্রাজ + ঋষি = রাজর্ষি; দেব + ঋষি = দেবর্ষি
অ/আ + এ/ঐহিত + এষী = হিতৈষী; মত + ঐক্য = মতৈক্য
অ/আ + ও/ঔবন + ওষধি = বনৌষধি; মহা + ঔষধ = মহৌষধ
ই/ঈ/উ/ঊ + ভিন্ন স্বরয্ / ব্ + সেই স্বরযদি + অপি = যদ্যপি; ইতি + আদি = ইত্যাদি (ই-জাত, য্‌-ফলা); সু + আগত = স্বাগত; অনু + এষণ = অন্বেষণ (উ-জাত, ব-ফলা)

মনে রাখার কৌশল: ই/ঈ-কার থাকলে বিচ্ছেদে “ই” বা “ঈ” খুঁজুন আর য-ফলা সরিয়ে ফেলুন; উ/ঊ-কার থাকলে “উ” বা “ঊ” খুঁজুন আর ব-ফলা সরান। এই দুটো নিয়ম প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি রিপিট হয় বলে আলাদা করে গুরুত্ব দিন।


নিয়ম ২: ব্যঞ্জনসন্ধিতে “ম-এর পঞ্চম বর্ণ” ও “ৎ-পরিবর্তন” নিয়ম প্রয়োগ করুন

২.১ ম্‌-এর নিয়ম

সম্‌, কিম্‌-এর মতো ম্‌-অন্ত উপসর্গের পরে ব্যঞ্জনবর্ণ এলে, ম্‌ সেই বর্গের পঞ্চম বর্ণে (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম) বদলে যায়; আধা-স্বরবর্ণ বা শিসধ্বনির আগে অনুস্বার (ং) হয়ে যায়।

উপসর্গ + পরের শব্দসন্ধিকোন বর্গ
সম্ + কর্ষণসংকর্ষণক-বর্গ, পঞ্চম বর্ণ ঙ
সম্ + চয়সঞ্চয়চ-বর্গ, পঞ্চম বর্ণ ঞ
সম্ + তাপসন্তাপত-বর্গ, পঞ্চম বর্ণ ন
সম্ + পূর্ণসম্পূর্ণপ-বর্গ, পঞ্চম বর্ণ ম
সম্ + যতসংযতয-এর আগে অনুস্বার
সম্ + সারসংসারস-এর আগে অনুস্বার
সম্ + বাদসংবাদব-এর আগে অনুস্বার

মনে রাখার কৌশল: অনুস্বার (ং) দেখলে বিচ্ছেদে সরাসরি “ম্‌” বসিয়ে দিন (সংসার = সম্ + সার), আর সংযুক্তবর্ণে ঙ/ঞ/ণ/ন/ম দেখলে সেটাও মূলে “ম্‌”-ই ছিল ধরে নিন।

২.২ ৎ (ত্‌)-এর পরিবর্তন

তৎসম শব্দের শেষে ৎ থাকলে পরের ব্যঞ্জনবর্ণ অনুযায়ী তা বদলায়।

মূল + পরের শব্দসন্ধিপরিবর্তন
সৎ + চরিত্রসচ্চরিত্রৎ + চ = চ্চ
সৎ + জনসজ্জনৎ + জ = জ্জ
জগৎ + নাথজগন্নাথৎ + ন = ন্ন
উৎ + জ্বলউজ্জ্বলৎ + জ = জ্জ্ব
উৎ + হারউদ্ধারৎ + হ = দ্ধ
তৎ + হিততদ্ধিতৎ + হ = দ্ধ

নিয়ম ৩: বিসর্গের চারটি রূপান্তর চিহ্নিত করুন

বিসর্গ (ঃ) কেবল তৎসম শব্দে থাকে এবং পরের বর্ণ অনুযায়ী চার রকম রূপ নেয়।

বিসর্গের পরের বর্ণফলউদাহরণ
ঘোষ ধ্বনি বা স্বরবর্ণও-কার বা রমনঃ + হর = মনোহর; মনঃ + যোগ = মনোযোগ; তপঃ + বন = তপোবন; নিঃ + আকার = নিরাকার
চ / ছশ্নিঃ + চয় = নিশ্চয়; নিঃ + চেষ্ট = নিশ্চেষ্ট
ত / থস্নিঃ + তব্ধ = নিস্তব্ধ; দুঃ + তর = দুস্তর
ক / খ / প / ফ বা কোনো পরিবর্তন নেইঅপরিবর্তিত বা ষ্দুঃ + খ = দুঃখ; নিঃ + কলঙ্ক = নিষ্কলঙ্ক

অন্তঃপুর (অন্তঃ + পুর), প্রাতরাশ (প্রাতঃ + আশ)-এর মতো শব্দে “র” রূপে বিসর্গ পরিবর্তিত হয় কারণ পরের বর্ণ স্বরধ্বনি বা ঘোষ ব্যঞ্জন।

মনে রাখার কৌশল: ও-কার বা রেফ (র্) দেখলে সেখানে মূলে বিসর্গ ছিল ধরে নিন এবং বিচ্ছেদে ঃ বসান।


নিয়ম ৪: নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি আলাদা করে মুখস্থ রাখুন

কিছু সন্ধি কোনো প্রচলিত নিয়ম মানে না, ভাষারীতিতে প্রচলিত থাকার কারণে সরাসরি গৃহীত হয়েছে। এগুলোকে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বলে এবং পরীক্ষায় এখান থেকে প্রশ্ন এলে নিয়ম প্রয়োগ করে বের করা যায় না, মুখস্থ রাখাই একমাত্র পথ।

সন্ধিবদ্ধ শব্দবিচ্ছেদ
গবাক্ষগো + অক্ষ
গোষ্পদগো + পদ
প্রৌঢ়প্র + ঊঢ়
বৃহস্পতিবৃহৎ + পতি
ষোড়শষট্ + দশ
একাদশএক + দশ
মার্তণ্ডমার্ত + অণ্ড
কুলটাকুল + অটা
পরস্পরপর + পর

নিয়ম ৫: বিচ্ছেদের পর অর্থ মিলিয়ে যাচাই করুন

সন্ধি বিচ্ছেদে একাধিক শব্দ একই রকম দেখতে হতে পারে, কিন্তু একটিই ব্যাকরণসম্মত ও অর্থবহ। বিচ্ছেদ করার পর দুই অংশ মিলিয়ে দেখুন মূল শব্দের অর্থের সঙ্গে মেলে কি না।

উদাহরণ: মনোহর ভাঙলে মনঃ + হর হয়, আর “মন হরণকারী” অর্থটি মূল শব্দ “মনোহর”-এর (আকর্ষণীয়) সঙ্গে সরাসরি মেলে। এই মিল না থাকলে বিচ্ছেদ ভুল হয়েছে বুঝতে হবে। এই যাচাই ধাপটি এড়িয়ে গেলে গঠনগতভাবে ঠিক দেখতে লাগা ভুল উত্তর বেছে নেওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষত এমসিকিউ-তে যেখানে দুটি অপশন কাছাকাছি রকম দেখায়।


পরীক্ষায় ঘনঘন আসা সন্ধি বিচ্ছেদ

সন্ধিবদ্ধ শব্দবিচ্ছেদধরন
বিদ্যালয়বিদ্যা + আলয়স্বরসন্ধি
হিমালয়হিম + আলয়স্বরসন্ধি
মহোৎসবমহা + উৎসবস্বরসন্ধি
পরোপকারপর + উপকারস্বরসন্ধি
দেবেন্দ্রদেব + ইন্দ্রস্বরসন্ধি
নরেন্দ্রনর + ইন্দ্রস্বরসন্ধি
রাজর্ষিরাজ + ঋষিস্বরসন্ধি
ইত্যাদিইতি + আদিস্বরসন্ধি
যদ্যপিযদি + অপিস্বরসন্ধি
স্বাগতসু + আগতস্বরসন্ধি
অন্বয়অনু + অয়স্বরসন্ধি
সচ্চরিত্রসৎ + চরিত্রব্যঞ্জনসন্ধি
সজ্জনসৎ + জনব্যঞ্জনসন্ধি
জগন্নাথজগৎ + নাথব্যঞ্জনসন্ধি
উজ্জ্বলউৎ + জ্বলব্যঞ্জনসন্ধি
সংসারসম্ + সারব্যঞ্জনসন্ধি
সংবাদসম্ + বাদব্যঞ্জনসন্ধি
সঞ্চয়সম্ + চয়ব্যঞ্জনসন্ধি
সংযতসম্ + যতব্যঞ্জনসন্ধি
মনোহরমনঃ + হরবিসর্গসন্ধি
তপোবনতপঃ + বনবিসর্গসন্ধি
মনোযোগমনঃ + যোগবিসর্গসন্ধি
নিরাকারনিঃ + আকারবিসর্গসন্ধি
নিঃশব্দনিঃ + শব্দবিসর্গসন্ধি
দুঃখদুঃ + খবিসর্গসন্ধি
অন্তঃপুরঅন্তঃ + পুরবিসর্গসন্ধি
প্রাতরাশপ্রাতঃ + আশবিসর্গসন্ধি
গবাক্ষগো + অক্ষনিপাতনে সিদ্ধ
প্রৌঢ়প্র + ঊঢ়নিপাতনে সিদ্ধ

সাধারণ যেসব ভুল হয়

  • সন্ধির ধরন (স্বর/ব্যঞ্জন/বিসর্গ) না জেনেই সরাসরি ভাঙা শুরু করা।
  • বিসর্গকে “স” বা “হ” ভেবে ভুল বসানো, যেমন দুঃখ-কে “দুস + খ” লেখা, সঠিক হলো দুঃ + খ।
  • ম্‌-জাত সংযুক্তবর্ণ (ঙ, ঞ, ণ, ন) দেখে সেটাকে মূল বর্ণ ধরে নেওয়া, সম্‌-এ ফেরত না আনা।
  • অর্থ যাচাই না করেই আকৃতিগতভাবে কাছাকাছি অপশন বেছে নেওয়া, বিশেষত এমসিকিউতে।
  • বাংলা ও তৎসম সন্ধির নিয়ম গুলিয়ে ফেলা, বাংলা শব্দে বিসর্গ খোঁজা।
  • নিপাতনে সিদ্ধ শব্দে প্রচলিত নিয়ম প্রয়োগ করার চেষ্টা করা, যেমন প্রৌঢ়-কে স্বরসন্ধির নিয়মে ভাঙার চেষ্টা।

দ্রুত রিভিশন

১. আগে চিনুন: বাংলা সন্ধি (স্বর+ব্যঞ্জন) না তৎসম সন্ধি (স্বর+ব্যঞ্জন+বিসর্গ)
২. স্বরসন্ধি: অ/আ+অ/আ=আ, অ/আ+ই/ঈ=এ, অ/আ+উ/ঊ=ও, অ/আ+ঋ=অর্,
   অ/আ+এ/ঐ=ঐ, অ/আ+ও/ঔ=ঔ, ই/উ-জাত=য্‌/ব্‌+স্বর
৩. ব্যঞ্জনসন্ধি: সম্‌+ব্যঞ্জন=বর্গের পঞ্চম বর্ণ বা অনুস্বার; ৎ+ঘোষবর্ণ=পরিবর্তিত রূপ
৪. বিসর্গসন্ধি: ঘোষ/স্বরের আগে ও-কার বা র; চ/ছ-এর আগে শ্‌; ত/থ-এর আগে স্‌
৫. নিপাতনে সিদ্ধ শব্দ আলাদা মুখস্থ করুন, এবং সবসময় অর্থ মিলিয়ে যাচাই করুন

অনুশীলনের জন্য শব্দ

নিজে বিচ্ছেদ করার চেষ্টা করুন, তারপর মিলিয়ে দেখুন: সদুপদেশ, পরাধীন, মহর্ষি, সদাশয়, গিরীশ, লোকোত্তর, সুরেন্দ্র, দিগন্ত, বিদ্যুৎ + লতা, উৎ + লাস।

উত্তর: সৎ+উপদেশ, পর+অধীন, মহা+ঋষি, সৎ+আশয়, গিরি+ঈশ, লোক+উত্তর, সুর+ইন্দ্র, দিক্+অন্ত, বিদ্যুল্লতা, উল্লাস।

Md Asiful Haque

লেখক: মো. আসিফুল হক

সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
৪৩তম বিসিএস (প্রশাসন ক্যাডার)
কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়

শিক্ষা: MBA (IBA), BSc in CSE (BUET)

বিসিএস পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর সরকারি প্রশাসনে যোগদান করেছি ২০২৫ সালে। প্রতিদিন মাঠ পর্যায়ে সংবিধান, আইন, ও প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রয়োগ করার অভিজ্ঞতা থেকে লিখি এই ব্লগ।

Leave a comment